প্রক্সি পেশা

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৪, ১০:০১ এএম

 

বিপুল পরিমাণ বেকারত্বের এ দেশে চাকরি যেন সোনার হরিণ। সেই চাকরির পরীক্ষায় পাস করতে অসদুপায় অবলম্বনের আশ্রয়ও নেয় অনেকে। তার একটি হচ্ছে অন্য কাউকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো। একই ব্যাপার ঘটে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার বেলাতেও। এসব প্রক্সি পরীক্ষার্থী অর্থ বা অন্য কোনো কারণে আইনত দ-নীয় এ কাজে জড়িত হন। অনেকে পেশা হিসেবেও এই কাজ বেছে নিয়েছেন। অনেক সময় তারা ধরা পড়েন, অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রক্সি পরীক্ষার্থীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়। আবার এ ঘটনায় মামলাও করে কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু এসব মামলার পরিণতি কী তা জানা যায় না। মূলত কর্র্তৃপক্ষের অবহেলায় প্রক্সিদাতারা পার পেয়ে যান বলে দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড আর প্রক্সি দিলে ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে গত বছর জানুয়ারি মাসে ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন আইন ২০২৩ বিল’ সংসদে পাস হয়েছে। কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনি প্রক্সি পরীক্ষা। গত ২৩ জুন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার অভিযোগে ১০ জনকে আটক করা হয়। আটক পরীক্ষার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় বেশ ভালো নম্বর পেয়েছিলেন। মৌখিক পরীক্ষায় তাদের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন করা হলে উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। পরে হাতের লেখা পরীক্ষা করে মিল পাওয়া যায়নি। তখনই আটক শিক্ষার্থীদের পুলিশে দেওয়া হয়েছে। মে মাসে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সহকারী পদে পরীক্ষায় আরেকজন প্রক্সি পরীক্ষার্থী ধরা পড়েন। ফেব্রুয়ারি মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ধরা পড়েন আরেক প্রক্সি পরীক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, টাকার বিনিময়ে এই পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছিলেন ঢাকা কলেজের তৃতীয় বর্ষের ওই শিক্ষার্থী। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ধরা পড়া এক প্রক্সি শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু মামলার অগ্রগতি স্থবির হয়ে আছে। জানতে চাইলে মামলার আইও পুলিশ পরিদর্শক তৌহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ বাদী হয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং তা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু বাদীপক্ষের অনাগ্রহে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় বিচার ও রায় পেতে অনেক দেরি হচ্ছে। তা ছাড়া মামলায় উল্লিখিত বাদীপক্ষের মোবাইল নম্বরে কল করে কিংবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। একই রকম ঘটনা ঘটে ২০২২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে আসা এক পরীক্ষার্থীর বেলায়ও। বিশ্ববিদ্যালয়

কর্র্তৃপক্ষ বাদী হয়ে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় একটা মামলা করলেও এ বিষয়ে পরবর্তী সময় তাদের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রক্সিবিরোধী এসব মামলায় বাদীপক্ষের অনাগ্রহের কারণে মামলাগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এদিকে আসামিরা জামিন নিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম করছেন। ফলে প্রক্সিবিরোধী মামলাগুলো আর আলোর মুখ দেখে না। 

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রক্সি পরীক্ষার্থী বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করেছি বেশ কয়েক বছর হয়েছে। এর মধ্যে অনেক সরকারি চাকরির পরীক্ষা ও ভাইভাও দিয়েছি। কিন্তু চাকরি না হওয়ায় এবং চাকরির বয়স প্রায় শেষ হতে যাওয়ায় শেষমেশ এমন পথ বেছে নিয়েছি।’ তিনি আরও জানান, প্রতি পরীক্ষার জন্য ৩ থেকে ৫ হাজার টাকার চুক্তি হয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে ধরা পড়ার ভয় অনেক বেশি। অবশ্য প্রবেশপত্রে আসল পরীক্ষার্থীর বদলে প্রক্সির ছবি এমনকি পরিদর্শকের কাছে থাকা ছবি পরিবর্তন করে এই ঝুঁকি হ্রাস করা হয় আর বিশেষ ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মাধ্যমে করা এসব কাজের জন্যও বিশেষজ্ঞদের ভাড়া করা হয়। অনৈতিক উপায়ে ভর্তি বা চাকরি পাওয়া নৈতিকভাবে মারাত্মক অপরাধ। আর এভাবে নৈতিকতা ভেঙে পার পেয়ে গেলে পরবর্তী জীবনে এসব মানুষ আরও বড় বড় অপরাধে লিপ্ত হবে, যা দেশের সার্বিক অবস্থার অবনতি ঘটাবে। এ কারণে প্রক্সি দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর অপরাধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী আর তাই একে কঠোরভাবে থামানো জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত