প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তারাও বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। সম্প্রতি দিল্লি সফরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে আলোচনা ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সে বিষয়ে জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, যেহেতু নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে ঢাকা ও দিল্লি নতুনভাবে পথচলা শুরু করেছে, সে ধারাবাহিকতায় ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর ‘স্মার্ট-বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ নিশ্চিত করার জন্য ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করার ব্যাপারে আমরা আলোচনা করেছি।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ওই বৈঠকে ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তা প্রকল্প ও রেল ট্রানজিটের বিষয়টি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, বাংলাদেশের দিকে তিস্তার পানি সংরক্ষণ ও পরিচালন পদ্ধতি উন্নয়নের জন্য শিগগিরই একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে চীন আমাদের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতও দিয়েছে। আরও প্রস্তাব এসেছে। অবশ্যই আমরা বিবেচনা করব, কোনটি গ্রহণ করলে তা আমার দেশের মানুষের কল্যাণে আসবে। কোন প্রস্তাবটা নিলে কতটুকু ঋণ নিলাম এবং কতটুকু আমাদের পরিশোধ করতে হবে, কতটুকু দিতে পারব এসব কিছু বিবেচনা করেই তো আমাদের পরিকল্পনা নিতে হবে।’ তিনি বলেছেন, ‘যেহেতু ভারতের কাছে আমাদের তিস্তার পানির দাবিটা অনেক দিনের, সে ক্ষেত্রে ভারত যদি আমাদের তিস্তা প্রকল্পটি করে দেয় তবে আমাদের সব সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, কাজেই ভারত যখন এগিয়ে এসেছে... ভারতের সঙ্গে যদি আমরা এই তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করি তাহলে পানি নিয়ে প্রতিদিন সমস্যায় পড়তে হবে না। আমরা সেই সুবিধাটা পাব।
প্রধানমন্ত্রী সুন্দর কথাই বলেছেন। বিষয়টা হলো বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তো এমনই হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের সঙ্গে ভারতের পানি বণ্টনের বিষয়ে অভিজ্ঞতা ভালো না। ফারাক্কা বাঁধ আমাদের ভুগিয়েছে। এখন তিস্তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ভারত থেকে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ ৫৪টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আর তিনটি নদী বাংলাদেশে এসেছে মিয়ানমার থেকে। এই অভিন্ন নদীগুলোর মধ্যে একটি আবার এমন নদী আছে, যেটি ভারত থেকে বাংলাদেশে গিয়ে আবারও ভারতে প্রবেশ করেছে। সেটি আত্রাই নদী। সাম্প্রতিককালে নদীর জল বণ্টনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছে তিস্তার জল বণ্টন। শুধু অমীমাংসিত নয়, তিস্তার জল বণ্টন বেশ জটিলও। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৮৩ সাল থেকে তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা রয়েছে। ওই ব্যবস্থা অনুযায়ী ভারত ৩৯ শতাংশ আর বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ পানি পাবে। কিন্তু বাকি ২৫ শতাংশ নিয়ে কখনই ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি দুই দেশ। তবে ২০১১ সালে যে চুক্তি প্রায় সই হতে গিয়েও আটকে গিয়েছিল, তা অনুযায়ী ভারত ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ আর বাংলাদেশ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পানি পাবে এমন একটা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেঁকে বসেন। তার যুক্তি ছিল তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে বাংলাদেশকে তিস্তার জল দিয়ে দেওয়া হলে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি জেলার কৃষকরা চাষের পানি পাবেন না। এর ফলে অন্তত এক লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে চাষের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ওই চুক্তি তাই আর এগোয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তিস্তার ড্রেজিং করে প্রবাহ বৃদ্ধির এক প্রকল্পে চীনা সহায়তার প্রসঙ্গটা সামনে আসায় ভারত বিষয়টি নিয়ে আবার তৎপরতা দেখাচ্ছে। এবারও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেঁকে আছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও তিস্তাচুক্তি বাস্তবায়িত হতে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রাথমিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আগে এ বৈঠক ত্রিপক্ষীয় স্তরের সবাইকে নিয়ে করা হতো। রাজ্যের নদীর ক্ষেত্রে রাজ্যকেও ডাকা হতো, কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় স্তরে। গঙ্গায় দীর্ঘদিন ধরে খনন (পলি মাটি তোলার কাজ) হচ্ছে না, সংস্কার হচ্ছে না। ফলে বাংলায় বন্যা ও ভাঙনের মতো সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। তিস্তা নিয়েও সমস্যা হয়েছে। এগুলো দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, রাজ্যের স্বার্থ জড়িত। সেখানে রাজ্যকে বাদ দিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হলো। তিনি তিস্তা চুক্তি এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি পাঠাচ্ছেন। অবশ্য মমতার অভিযোগ নাকচ করেছে দিল্লি।
গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। আর তিস্তা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জল দেওয়া হলে এখানে মানুষের সমস্যা সৃষ্টি হবে, এটা কেন্দ্র জানে। তারপরও তারা রাজ্যের সঙ্গে কথা না বলে এই কাজ করল। বড় বাঁধ দিয়ে সিকিমে ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। ফলে শীত মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর অংশে পানিপ্রবাহ কমে যায়। যৌথ নদীর বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এককভাবে সমঝোতা স্মারক সই করার বিষয়টি লোকসভার অধিবেশনেও তুলবে তৃণমূল কংগ্রেস। বিষয়টি নিয়ে তারা যাতে অন্য দলেরও সমর্থন পায়, তা মাথায় রেখে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। তৃণমূল কংগ্রেসের বিশেষজ্ঞ দল বলেছে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মধ্য পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদের নদীয়ায় বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ফারাক্কার বাঁধকে মুর্শিদাবাদ ও মালদায় গঙ্গার ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, ২০১৭ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও ফরাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছিলেন। অতীতে সিপিআইএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারও তিস্তা চুক্তির প্রবল বিরোধিতা করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের দলের কাছে রাজ্যের মানুষের চাহিদা প্রাধান্য পাবে। বিষয়টি মাথায় রেখেই ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন। মমতা ব্যানার্জি সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, এবার রাজ্যকে বাদ দিয়ে সেই আলোচনা দ্বিপক্ষীয় স্তরে করা হয়েছে।
এদিকে তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার এবং ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ভারতের সর্বশেষ প্রস্তাব এবং চীন ইতিমধ্যে একই প্রকল্পের জন্য আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রস্তাব করায় বেইজিং এবং নয়াদিল্লির মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগে, ভারত বাংলাদেশের উত্তরে প্রস্তাবিত তিস্তা নদীর ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, যেখানে চীন ইতিমধ্যে একশ কোটি ডলার ব্যয় করে প্রকল্পের জন্য একটি সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। কারণ তিস্তার সংকট নিরসনে ভারতের কাছে বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘদিন ধরে আহ্বান জানিয়ে আসছে। সাড়া না পেয়ে ঢাকা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বেইজিংয়ের সমর্থন চেয়েছে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, চীনা সমীক্ষার পর হঠাৎ ভারতের আগ্রহ বাড়ল কেন? আর ভারতের আগ্রহের কারণে বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যেটা ভূরাজনীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিস্তা নিয়ে চীনের আগ্রহ মূলত কৌশলগত। এই প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহী হয়ে ওঠার বড় কারণ হচ্ছে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রজেক্ট। বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশকে একই সুতায় গাঁথতে চাইছে। বিআরআই প্রকল্পের আওতাধীন বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর। প্রস্তাবিত এই করিডোরের মাধ্যমে চীন তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। এ জন্য তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পকে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।
আর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহকে ভারত বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। ভারত মনে করে, চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে চায়। এ কারণে তিস্তা প্রকল্পের যে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে সেটি অস্বীকার করা যাবে না। এ ছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নদীর দুপাশে শহর গড়ে উঠবে, নদীশাসন হবে এবং নদীর নাব্যতা থাকবে। ফলে পুরো এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এবং দুই কোটি মানুষের জীবনও বদলে যাবে। ফলে সেখানে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরির পাশাপাশি ভারতবিরোধী মনোভাব আরও প্রবল হবে। বরং এ রকম একটা প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখলে তারা বাংলাদেশের ওপর চাপ বজায় রাখতে পারে। তিস্তা ইস্যু সমাধান হয়ে গেলে বাংলাদেশের ওপর ভারতের যে প্রভাব, সেটা কমবে। অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তখন আর ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকবে না।
এ ছাড়া তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগও রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে চীনের জোরালো উপস্থিতি থাকবে। এত কাছাকাছি চীনের অবস্থান ভারতের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি হতে পারে, এ কারণেও ভারত চাইছে তিস্তা প্রকল্পটি তাদের হাতে রাখতে।
ভারত সফরের আগে ১২ জুন জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হামিদুল হক খন্দকারের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনার সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কাছে ঋণ চাওয়া হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রায় আট হাজার ২১০ কোটি টাকার পিডিপিপি (প্রিলিমিনারি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) ২০২০ সালের আগস্টে ইআরডিতে জমা দেয়। এ থেকে বোঝা যায় চীনের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ভারত তিস্তা প্রকল্প করে দিলে আমরা লাভবান হবো। এ কারণে তিস্তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
জুলাইতে চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরই বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। প্রকল্পের ব্যাপারে চীন কী অবস্থান নেয় তার ওপরেই নির্ভর করবে এই প্রকল্পের ব্যাপারে বাংলাদেশ দুই দেশের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে। তবে ভারতের আপত্তির মুখে তিস্তা প্রকল্প চীনের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
