কাজাখস্তানের জুয়া ইন্ডাস্ট্রি

জুয়ার লাভের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৪, ১২:০৭ এএম

কাজাখস্তানের জুয়া ইন্ডাস্ট্রি আজ এক বিশাল লাভজনক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই লাভের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক নতুন প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে এবং কে এই লাভের নিয়ন্ত্রণ করবে? দেশটির সংসদ সদস্যরা চাচ্ছেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হোক।

কাজাখস্তানের সংসদে সম্প্রতি নতুন একটি বিলের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, যার মাধ্যমে জুয়া শিল্পকে পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও আইনের খসড়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি, এটি শুধুমাত্র একটি জনস্বাস্থ্য বিল হিসেবে প্রস্তাবিত হয়েছে। এতে বেটিং করার আইনি বয়স ২৫ বছর (বিশ্বের সর্বোচ্চ) করা হবে এবং সরকারি কর্মচারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে।

BAC(বিএসি) বিতর্ক

নতুন প্রস্তাবে বাজি ধরার অ্যাকাউন্ট সেন্টারের (BAC, বিএসি) পুনর্গঠন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক উঠেছে। বিএসি-এর ক্ষমতা এত বিশাল যে এটি নিজেই জুয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। আইনটি পাস হলে, বিএসি কাজাখ জুয়ার বাজার থেকে সমস্ত লাভের ১.৫ শতাংশ পাবে এবং বাজারের অন্য অংশগ্রহণকারীদের নিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। কাজাখস্তানে ক্যাসিনো, বাজি ধরার এজেন্সি এবং বুকমেকারদের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। সোভিয়েত যুগে গোপন জুয়ার ক্লাব হিসেবে শুরু হওয়া বাজি ধরার ক্লাবগুলো এখন আন্তর্জাতিক অবস্থানে পৌঁছেছে।

অস্থিরতা কেন?

২০১৭ সালে জুয়া-বিরোধী আইন কার্যকর হতে শুরু করেছিল। প্রথমবারের মতো সংসদে বিএসি গঠনের প্রস্তাব ওঠে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। এই আইনটি মূলত বাধ্যতামূলকভাবে জুয়া শিল্পকে লক্ষ্য করে প্রণীত ছিল। ২০২০ সালে Exirius LLP  এবং PayBox নামের কাজাখ কোম্পানিগুলো বিএসি-এর সমস্ত কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার দায়িত্ব পায়। কিন্তু কাজাখ সংস্কৃতি উপমন্ত্রী সাকেন মুসাইবেকভ বিএসি-এর পক্ষে লবিস্টদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে বরখাস্ত হন। ফলে বিএসি সম্পর্কিত সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে কাজাখের দুই উপ-প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে সমস্ত ভবিষ্যৎ খসড়া আইনে বিএসি-এর উল্লেখ বাদ দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু এই নির্দেশনা উপেক্ষা করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

নতুন আইন নিয়ে আবারও আলোচনা হওয়ায় জুয়া শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে যে জনস্বাস্থ্য আইনটি বিএসি-কে পুনরায় চালু করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন, বুকমেকাররা হয়রানি বা নজরদারির ভয়ে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। ২০১৯ সালে অলিম্প নামের একটি স্বাধীন কাজাখ বুকমেকিং কোম্পানি বিএসি-এর প্রবর্তনের বিরুদ্ধে প্রেস কনফারেন্স করার পরপরই প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের গ্রেপ্তার করা হয়।

শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালে অলিম্প কোম্পানির আরও কয়েকজন কর্মচারীকে ২০১৪-২০১৯ সালে সংগঠিত অপরাধ গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার সন্দেহে জার্মানি ও সার্বিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। অভিযোগগুলো খুব স্পষ্ট ছিল না, বরং অভিযোগকারীরা প্রভাবশালী বলে ধারণা করা হয়। এমনকি অলিম্পের আইনজীবীরা শাস্তি কমানোর জন্য নানান যুক্তি ও প্রমাণ তুলে ধরেছেন। অভিযুক্তদের আত্মীয়রাও প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভের কাছে মামলাটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন।

অর্থনৈতিক প্রভাব

কাজাখস্তানের জুয়া শিল্প বেশ লাভজনক। ২০২০ সালে বাজি ধরার শিল্প থেকে প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির ০.১ শতাংশ। এছাড়াও, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অ্যানালাইসিস অব দ্যা গেম্বলিং ইন্ডাস্ট্রির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ সালে কাজাখস্তানের অনলাইন ক্যাসিনো থেকে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা ২০১৯ সালের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। H2 Gambling Capital-এর মতে, কাজাখস্তান বিশ্বের গেম্বলিং বাজারের আয়তনের দিক থেকে ৭৭তম স্থানে রয়েছে।

ভবিষ্যৎ উদ্বেগ

কাজাখস্তানের বাজি ধরার শিল্প একটি প্রাচীন ইতিহাস এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ধারণ করে। তবে, BAC-এর কার্যকরী ইতিহাস এবং বর্তমান আইনের পুনরুত্থান শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করা, যাতে বৈধ কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে পারে এবং দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

করণীয় কী?

বোঝা যাচ্ছে, কাজাখস্তানের জুয়া শিল্প পরিচালনাকারীদের অবশ্যই তদারকির আওতায় আনা জরুরি। তবে সেই তদারকি ন্যায্য ও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি, যেন এই খাতের ব্যবসাগুলো অপব্যবহার থেকে রক্ষা পায়। কাজাখস্তানে BAC-এর ইতিহাস যেমন উদ্বেগজনক, তেমন বর্তমান আইনের পুনরুত্থানও আশঙ্কামুক্ত নয়। বর্তমান আইনটি সঠিকভাবে পরীক্ষা করা উচিত, যাতে এটি শুধুমাত্র ইঅঈ-এর ট্রোজান ঘোড়া হয়ে না ওঠে এবং ইঅঈ-কে বাজার দখলের হাতিয়ার বানানো না হয়।

কাজাখস্তানের বাজি ধরার শিল্পের বর্তমান অবস্থা বেশ জটিল। সরকারের আইনানুগ চাপে থাকলেও এই শিল্প থেকে আয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এর সঙ্গে কর এবং অন্যান্য ফি থেকে রাজস্ব আয় দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজাখ অর্থনীতিতে জুয়া শিল্পের অবদান বেড়ে চলেছে। দেশটির প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা বৈধ ব্যবসা গড়ে তুলেছেন যা দেশের অর্থনীতির উত্থানে সহায়তা করছে। তবে, BAC কার্যকর হলে এই শিল্পের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে এবং বৈধ কোম্পানিগুলো বিপদে পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত ন্যায্য এবং স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করা। কাজাখস্তানের বাজি ধরার শিল্প একটি প্রাচীন ইতিহাস এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ধারণ করে। তবে, BAC-এর কার্যকরী ইতিহাস এবং বর্তমান আইনের পুনরুত্থান শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করা, যাতে বৈধ কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে পারে এবং দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

এশিয়া-প্যাসিফিক কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিন দি ডিপ্লোম্যাট

অনলাইন থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক

লেখক: গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত