চট্টগ্রামে থানাহাজতে এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরীর চান্দগাঁও থানার হাজতখানায় মো. জুয়েল (২৬) নামের ওই আসামিকে গলায় শার্ট প্যাঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখা যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, জুয়েলকে গত মঙ্গলবার রাত ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে নগরের কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর চান্দগাঁও থানাহাজতে রাখা হয়। সেখানেই তিনি সকাল ৬টা ২৫ মিনিটে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন বলে পুলিশ দাবি করেছে। অর্থাৎ গ্রেপ্তারের ছয় ঘণ্টা পর থানাহাজতে আত্মহত্যা করেন জুয়েল। তবে কী কারণে আত্মহত্যা করেছেন, তা জানাতে পারেনি পুলিশ।
মারা যাওয়া জুয়েল চান্দগাঁও থানার খেজুরতলা এলাকার মৃত আবদুল মালেক প্রকাশ আবদুল মাবুদের ছেলে।
জুয়েল এর আগেও তাদের বাসায় দুবার আত্মহননের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে পুলিশের গাফিলতির কারণে জুয়েলের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি বড়বোন সালমা আক্তারের। জুয়েলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে গতকাল সকালে চান্দগাঁও থানায় ছুটে যান মা মিনারা বেগম ও বড়বোন সালমা আক্তার। এ সময় থানা ভবনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।
বড়বোন সালমা আক্তারের ভাষ্য, জুয়েল ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতেন। এক গ্যারেজের মালিকের কাছ থেকে কিস্তিতে জুয়েলকে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনে দেন তার মা। কয়েক দিন আগে তার কাছ থেকে সেই রিকশাটি ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। এরপর থেকে রিকশা মালিকের ক্রমাগত মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেননি তিনি। তিন দিন আগেও জুয়েল তাদের বাসার বাথরুমে পরনের বেল্ট ঝুলিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের বাধায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
পুলিশের দাবি, অস্ত্র মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয় থানাহাজতে। সেখানে অন্য কোনো হাজতি ছিলেন না। ভোরে পরনের শার্ট দিয়ে থানাহাজতের ভেন্টিলেটরের সঙ্গে গলায় ফাঁস নেন জুয়েল। হাজতখানার সিসিটিভি ফুটেজে তার আত্মহননের দৃশ্য ধরা পড়ে। গতকাল দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করার কথা ছিল।
জুয়েলের বড়বোন সালমা আক্তার প্রশ্ন করে বলেন, থানাহাজতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। সেখানে সারাক্ষণ দায়িত্ব পালন করেন দু-এজন পুলিশ সদস্য। তাহলে হেফাজতে থাকা একজন আসামির জীবন কেন তারা রক্ষা করতে পারলেন না? পুলিশ তার ভাইয়ের মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না। পুলিশের গাফিলতিতেই তার ভাই মারা গেছেন।
জুয়েলের মা মিনারা বেগম আহাজারি করতে করতে থানায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় এনেছেন আপনারা। সে হাসিমুখে আপনাদের সঙ্গে এসেছে। সে কেন মারা যাবে? তাকে আমার কাছে ফেরত দেন। আমি আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাই।’
জানা গেছে, মৃত মো. জুয়েলের বাড়ি চান্দগাঁও থানার খেজুরতলা এলাকায়। তবে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতেন নগরের পাথরঘাটা এলাকায়। তারা তিন ভাই ও তিন বোন। জুয়েলের স্ত্রী ও ছয় মাস বয়সী এক পুত্রসন্তান আছে।
জুয়েলের মা মিনারা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিস্তি নিয়ে তাকে একটি অটোরিকশা কিনে দিই। কিন্তু সেটি চুরি হয়ে যায়। এরপর থেকে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার জন্য মালিকপক্ষ আমাদের চাপ দিতে থাকে। ছেলেকেও মারধর করেন তারা। সেই হতাশা থেকে আমার ছেলে সুইসাইড করেছে। কিন্তু হাজতখানার মতো নিরাপদ জায়গায় আমার ছেলের ফাঁসি খাওয়া থেকে পুলিশ বাঁচানোর চেষ্টা করেনি।’
জুয়েলের বড়বোন সালমা আক্তার বলেন, ‘কিস্তির টাকার চিন্তা থেকে বাঁচাতে আমার ভাইয়ের স্ত্রীর কিছু অলংকার বন্ধক রেখে ৩০ হাজার টাকা রিকশার মালিককে দেওয়া হয়। তবু তারা দেড় লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ভাইকে চাপ দিতে থাকেন। গ্যারেজ মালিকের মারধরের কারণে জুয়েল অসুস্থ হয়ে পড়ে। ব্যথায় কাতর সে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন করে আসছিল। মালিকপক্ষের মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। তবে পুলিশ তাকে বাঁচাতে পারত। তাদের গাফিলতি আছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘জুয়েল যে আত্মহত্যা করেছে, সেটা এক প্রকার নিশ্চিত হয়েছি আমরা। ওই সময় হাজতে জুয়েল ছাড়া আর কোনো আসামি ছিল না। জুয়েলের লাশ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুরতহাল করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।’
