ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণত হয়ে থাকে কট্টরপন্থি ও মধ্য বা সংস্কারপন্থি প্রার্থীদের মধ্যে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার পর জয়ের মালা উঠেছে সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ানের গলায়। জুনে প্রথম দফায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন দেশের ৬ কোটি ১০ লাখ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ। ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটাই ভোট পড়ার সবচেয়ে কম হার। গত ২৮ জুনের ভোটে কোনো প্রার্থীই সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় শুক্রবার দ্বিতীয় দফা ভোট হয়। গণনা হওয়ার পর পেজেশকিয়ান ৫৩.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। শনিবার তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সাঈদ জলিলির প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪৪.৩ শতাংশ। পেজেশকিয়ান ইরানের কুখ্যাত নৈতিকতা পুলিশের সমালোচক। দেশে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বহির্বিশে^র সঙ্গে ইরানের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানোর কথা বলে সাড়া ফেলেন তিনি।
এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি লক্ষণীয় দিক হচ্ছে ভোট পড়ার কম হার। লড়াই দ্বিতীয় দফায় গড়ানোর একটি বড় কারণ এটি। শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফা সময় বাড়িয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত তা চলে। দৃশ্যত ভোট পড়ার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে তা করা হয়। তাতেও খুব একটা কাজ হয়নি। দ্বিতীয় দফায় ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানানো হয়েছে, যা প্রথম দফার চেয়ে কিছুটা বেশি। উদারপন্থিদের আশঙ্কা ছিল ভোট কম পড়লে কট্টরপন্থি জলিলির সুবিধা হবে। ইরানের নির্বাচনে জনগণের পছন্দের বেশি সুযোগ নেই। প্রার্থীদের একটা বড় অংশ ইসলামি কট্টরপন্থি। তা ছাড়া ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি যতদিন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে থাকবে ততদিন সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে না এ বিশ্বাস নাগরিকদের উৎসাহ হারিয়ে ফেলার অন্যতম কারণ। গাজা সংঘাত নিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান-পাশ্চাত্য বিরোধ, অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষ এবং রাজনীতিবিমুখতার প্রেক্ষাপটে হলো এবারের ইরানের নির্বাচন।
৬৯ বছর বয়সী পেজেশকিয়ান একজন হৃদরোগবিষয়ক সার্জন ছিলেন। ২০০৮ সাল থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ শহরের এমপি তিনি। ভোটে দেশের প্রধান সংস্কারপন্থি জোট তাকে সমর্থন দিয়েছিল। সাবেক দুই সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানিরও সমর্থন পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ৫৮ বছর বয়সী জলিলি কট্টর পাশ্চাত্যবিরোধী। তার পেছনে অনেক কট্টরপন্থি ইরানির সমর্থন আছে। রক্ষণশীল নেতাদের কাছ থেকেও সমর্থন পেয়েছেন তিনি। ইরানের বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে ভোটের বিষয়ে আগ্রহ কম দেখা গেছে। রাজনীতি, সরকার ইত্যাদিতে আস্থা কমে গেছে তাদের। কারও কারও একেবারেই নেই। শবনম নামে এক পিএইচডি শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয়, এ দেশে প্রেসিডেন্টের বিশেষ কোনো স্বাধীনতা নেই। আর প্রচারণার সময় যেসব অঙ্গীকার করা হয় তার কোনো গুরুত্ব নেই। এগুলো মূলত ফাঁকা বুলি। সরকার বারবার বলে যাচ্ছে, ভোটের মাধ্যমে বৈধতা আসবে। এসএমএস দিয়ে বলা হচ্ছে, প্রতিটি ভোট রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি একটি সমর্থন। কিন্তু আমি মনে করি, আমার ভোটকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই ভোট দিতে চাই না।’ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ভোট কম পড়ার কথা স্বীকার করলেও তাকে বিদ্যমান ব্যবস্থা বা তার নিজের ওপর আস্থার অভাব বলে মানতে রাজি হননি। সকাল আটটায় কেন্দ্র খুলতেই ভোট দেন তিনি। এ সময় খামেনি আশা প্রকাশ করেন, দেশবাসী ‘সঠিক প্রার্থীকে’ বেছে নেবে।
দ্বিতীয় দফা ভোটের দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে দুই দফা মুখোমুখি বিতর্ক হয়েছে। এতে তারা অর্থনৈতিক সমস্যা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভোট কম পড়া ও ইন্টারনেটের ওপর সরকারি বিধিনিষেধ নিয়ে কথা বলেন। সংস্কারপন্থি পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের জনগণ তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে তিতিবিরক্ত। সরকার যেভাবে দেশ চালাচ্ছে তাতে তারা অসন্তুষ্ট। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দৃষ্টি দিয়ে তিনি ইরানকে বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন। অন্যদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দিতে নারাজ গোঁড়াদের পছন্দ জলিলি। তিনি জোর দিয়েই বলেছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইরানের যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে হওয়া পরমাণু চুক্তি চাঙা করার কোনো দরকার নেই। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে এর ভাগ্য সুতোয় ঝুলছে। ২০১৫ সালের ওই সমঝোতায় আর্থিকসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ইরান যাতে পরমাণু বোমা বানাতে না পারে তা নিশ্চিত করাই যুক্তরাষ্ট্রসহ তার পশ্চিমা মিত্রের লক্ষ্য। ইরান অবশ্য বরাবর বলে আসছে তার পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। জলিলি অতীতে খামেনির কার্যালয়সহ বিভিন্ন বড় দায়িত্বে কাজ করেছেন। কিন্তু তারপরও প্রভাবশালী রক্ষণশীল নেতাদের অনেকেই ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া পেজেশকিয়ানের পক্ষ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট স্টাডিজের অধ্যাপক ভালি নাসর বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানে এটি নজিরবিহীন ঘটনা। নাসর বলেন, জলিলি অতি কট্টর। তিনি ক্ষমতায় এলে স্থানীয় সমস্যা যেমন বাড়ত, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হওয়াও হয়ে উঠত জটিলতর। পেজেশকিয়ান দেশের স্থবির অর্থনীতি চাঙা করা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তার চারপাশ ঘিরে থাকবেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনির অনুগত ব্যক্তিরা। ইরানে প্রেসিডেন্ট যিনিই নির্বাচিত হন, তাকে সর্বোচ্চ নেতার নির্ধারণ করা রাষ্ট্রীয় নীতিই বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিতে শেষ কথাটা বলবেন খামেনিই। পরমাণু কর্মসূচি বা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে হামাস আর হিজবুল্লাহর মতো মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করার নীতিগত রদবদলের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। এ ছাড়া সংস্কারপন্থি হলেও পেজেশকিয়ান তার দেশের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল। এ অবস্থায় ক্ষমতাকেন্দ্র আর বিদ্যমান ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে পেজেশকিয়ান কী পরিবর্তন আনতে পারবেন জনগণ সে বিষয়ে সন্দিহান। তবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় নীতিতে কিছুটা হলেও প্রভাব রাখতে ও আয়াতুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরি মনোনয়নে যুক্ত থাকতে পারবেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, ইব্রাহিম রাইসির কট্টর শাসন আর পাশ্চাত্যের সঙ্গে সংঘাতজনিত ভোগান্তি থেকে কিছুটা স্বস্তি যদি দিতে পারেন পেজেশকিয়ান, আপাতত সেটাই হবে নাগরিকদের বড় পাওয়া।
লেখক : অনুবাদক ও সাংবাদিক
