বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটেও শিল্পে ভর করে বাড়ল প্রবৃদ্ধি

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:৫২ এএম

দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। কোনো কোনো শিল্প বন্ধও হয়ে গেছে। দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের এ নাজুক অবস্থার সত্যতা মেলে বিবিএসের হিসাবেও। কিন্তু এমন বিরূপ পরিস্থিতিতেও শিল্প খাত প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে আছে বলে দাবি করেছে বিবিএস।

শুধু শিল্প খাত নয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কৃষি ও সেবা খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর এতেই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬ দশমিক ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এ প্রান্তিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে কম থাকা সত্ত্বেও শিল্পের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশের বেশি। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপির তৃতীয় প্রান্তিকের তথ্য প্রকাশ করেছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে রেখেছিল সরকার। পরবর্তীকালে রিজার্ভ, জ্বালানিসহ নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হয়। বিবিএসের সাময়িক হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দেশের প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অনেক দূরে। চলতি ২০২৪-২৫ অথবছরেও দেশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের হিসাব করেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়। তথ্য বলছে, আলোচ্য সময়ে দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিই ছিল সবচেয়ে বেশি। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অন্য দুই খাতের মধ্যে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ ও সেবা খাতে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল।

শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি ছিল শঙ্কার পর্যায়ে। তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৯১ শতাংশ। অবশ্য গত অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিক থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় ছিল। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ধনাত্মক ধারায় এসেছে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে।

অন্যদিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও টানা দুই প্রান্তিকে ঊর্ধ্বমুখী। তৃতীয় প্রান্তিক শেষে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশে ঠেকেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে অর্থনীতিতে কৃষির প্রবৃদ্ধি বাড়ার যৌক্তিক কারণও আছে। এ সময়ে দেশের কৃষকদের ধান কাটার সময়। সরকারি হিসাব বলছে, এ বছর রেকর্ড পরিমাণ ধানের উৎপাদন হয়েছে।

সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিও আশাব্যঞ্জক ধারায় এসেছে। এ সময়ে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশে। সেবা খাতের আওতায় থাকা পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়ে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

তবে অর্থনীতিতে সেবা খাতের মধ্যে আর্থিক ও বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি এখনো ধুঁকছে। এ খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে দেশের আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নীতির কারণে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতে ক্রমাগত খেলাপি ঋণ বাড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকের ওই সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একীভূতকরণের তোড়জোড় চলছিল। গ্রাহকের আস্থাহীনতা আরও বাড়ায় সে সময় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের হিড়িকও দেখা গিয়েছিল।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ২০১৫-১৬ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৭ শতাংশ ও ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তবে কভিড-১৯ অতিমারীর প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হারও ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ সফলভাবে কভিড-১৯ অতিমারী মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। দেশের অর্থনীতি পুনরায় উচ্চপ্রবৃদ্ধির গতিপথে ফিরে আসে। ফলে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল।

কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট মন্দার প্রভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার পুনরায় হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়ায়। বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশে।

বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চলতি বাজার মূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা, যা আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৩৯ হাজার ৭১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চলতি বাজার মূল্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং স্থির মূল্যে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিবিএসের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চলতি বাজার মূল্যে জিডিপি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫০ লাখ ৪৮ লাখ ২৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা বেশি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত