পুলিশ কর্মকর্তা কামরুল হাসান ও তার স্ত্রী সায়মা বেগমের নামে থাকা ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ বেগম জেবুননেছা এ আদেশ দেন।
১৯৮৯ সালে পুলিশ বাহিনীতে উপপরিদর্শক পদে যোগ দেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান। সবশেষ পদোন্নতি পান অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) হিসেবে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগর পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগে কর্মরত। এর আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ৩৫ বছরের কর্মজীবনে ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে কামরুল ও তার স্ত্রী ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা সম্পত্তির মালিক। দুর্নীতির টাকায় বাড়ি, গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট, এমনকি জাহাজেরও মালিক বনে গেছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী। তাদের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১৩ মে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেন সংস্থাটির অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক এমরান হোসেন।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের মধ্যে ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী পরস্পর যোগসাজশে তাদের সম্পদ হস্তান্তর, বিক্রি অথবা বেহাত করার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক মো. এমরান হোসেন গতকাল আদালতে উভয়ের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আবেদন করেন।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) কাজী ছানোয়ার আহমেদ লাভলু বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা কামরুল হাসান ও তার স্ত্রী সায়মা বেগমের নামে সম্পদ ক্রোক ও জব্দ না করা গেলে তা হস্তান্তর হয়ে যেতে পারে বলে আমরা আদালতকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও হিসাব জব্দের আদেশ দেয়। আদালত সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার, এসিল্যান্ডদের তার সম্পত্তি ক্রোক এবং বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের তার নামে থাকা হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে।’
দুদকের চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক এমরান হোসেন বলেন, ‘দুদক অনুসন্ধান করে পুলিশ কর্মকর্তা কামরুল হাসান ও তার স্ত্রীর নামে ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর অবৈধ সম্পদের তথ্য পেয়েছে। এর আগে গত মে মাসে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ যাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হস্তান্তর করতে না পারেন, সেজন্য দুদকের পক্ষ থেকে সম্পত্তি ক্রোকের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। পরে আদালত তা মঞ্জুর করে।’
দুদক সূত্র জানায়, পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসানের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায়। ১৯৮৯ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। পদোন্নতি পেয়ে তিনি হাটহাজারী, বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তার সিএমপিতে পদায়ন হয়। তিনি সিএমপির প্রসিকিউশন শাখার সহকারী কমিশনার ও পরে অতিরিক্ত উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (অপরাধ) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে নগর-পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার প্রসিকিউশন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে বদলি করা হয়। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম আদালতের হাজতখানার আসামিদের জন্য সরকারি বরাদ্দের খাবার বিতরণ না করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিল উত্তোলন করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক এমরান হোসেন জানান, চট্টগ্রাম নগরে চান্দগাঁও থানাধীন অনন্যা আবাসিকে ৫ কাঠার প্লট (এ-২৫৯), ঢাকা জেলায় ১০-তলার ‘সাভার সিটি টাওয়ার’-এ যৌথ মালিকানায় ৭টি ফ্ল্যাট, সাভার আনন্দপুর মৌজায় ৫.২০ শতক জমি, একই এলাকার জালেশ্বর মৌজায় ২৭ শতক জমি, ১২-তলার সাভার সিটি সেন্টারের বেসমেন্ট ফ্লোরে ২২টি, প্রথম থেকে চতুর্থতলায় ৬টি এবং ৬ থেকে ১২-তলায় ৭টি ফ্ল্যাট আছে। চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ মৌজায় পৃথকভাবে প্রায় ৩২ শতক জমি, নগরের খুলশী কো-অপারেটিভ হাউজিংয়ে একটি ভবনের আটতলায় একটি ফ্ল্যাট (সি-৭) ও চট্টগ্রাম নগরের উত্তর হালিশহরে ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চে রেজিস্ট্রিকৃত (দলিল নম্বর ৪৩৩) ৪০ শতক জমি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কামরুল হাসান ও তার স্ত্রী সায়মার স্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৩৫ হাজার ৯১৯ টাকার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের উত্তর হালিশহরে পৃথকভাবে ৪০ শতক জমি, পশ্চিম নাছিরাবাদে শূন্য দশমিক ৩৩ শতক ও পৃথকভাবে দেড় শতক ভিটা, ঢাকার সাভারে ২৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি, সাভার সিটি সেন্টার অ্যান্ড টাওয়ার নামে একটি ১২-তলা ভবনের বেসমেন্টে ২২টি দোকানের সমান জায়গা, যা ইনফিনিটি মেগামল নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, প্রথম থেকে চতুর্থ তলায় ছয়টি দোকান এবং এর ওপরে সাতটি ফ্ল্যাট।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে আরও আছে, নগরের খুলশী মৌজায় দি চিটাগং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের আওতাধীন জমিতে নির্মিত ফয়জুন ভিলা নামে একটি ভবনে ২৭০৬ বর্গফুট জায়গা, পশ্চিম নাছিরাবাদে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও পৃথকভাবে শূন্য ছয় দশমিক ৫৯ শতাংশ নাল জমি, পশ্চিম নাছিরাবাদে ৭ শতাংশ ভিটার ওপর ঘর, ঢাকার সাভারের আনন্দপুরে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ নালজমি, সাভার সিটি টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট এবং সিডিএর অনন্যা আবাসিক এলাকায় পাঁচ কাঠার একটি প্লট।
স্বামী-স্ত্রী দুজনের অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ১৫ লাখ করে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪৫ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র, সায়মা হাসানের নামে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা মূল্যের চারটি লাইটারেজ জাহাজ এমভি প্যাসিফিক রাইডার, এমভি পানামা ফরেস্ট-১, এমভি রাইসা তারাননুম এবং বার্জ আল বাইয়েৎ।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩১ মে দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সম্পদের অনুসন্ধানের অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের ১৪ আগস্ট তাকে দুদক কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে দুদক কর্মকর্তা এমরান হোসেন চলতি বছরের ১৩ মে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৭৩ লাখ ২২ হাজার ৪৪ টাকা এবং তার স্ত্রী সায়মা বেগমের নামে এক কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার ১৮৮ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
