সময় বড় নিষ্ঠুর। সময় বড় নির্মম। কালের আহ্বানে একদিন সাড়া দিতেই হয়। অনিচ্ছুক মনকে বাগে এনে নিতে হয় বিদায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়’। আনহেল ডি মারিয়া এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আর একটি ম্যাচ, তারপরই তুলে রাখবেন জাতীয় দলের জার্সিটা। কিন্তু মন কি আর মানে? কানাডার বিপক্ষে সেমিফাইনালের পর ডি মারিয়ার কান্না সেটাই কি বলে দেয় না? আর ২৪ ঘণ্টা পর সব অনুরোধ, আবেগ আর চোখের জল উপেক্ষা করে ক্যারিয়ারে ইতি টানবেন ডি মারিয়া। কিন্তু কোথায় রেখে যাবেন নিজের ক্যারিয়ার?
আর্জেন্টিনা ফুটবলের প্রসঙ্গ উঠলেই সবার আগে উঠে আসে দুটি নাম ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা আর লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। এ ছাড়া আলফ্রেডো ডি স্টেফানো, মারিও আলবার্তো কেম্পেস, হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হাভিয়ের মাশচেরানোদের নাম চলে আসে। কিন্তু ক্যারিয়ারজুড়ে লিওনেল মেসির ছায়ার নিচে থাকা ডি মারিয়ার নামটাও কি আসে না? অবশ্যই আসে। বরং বৈশ্বিক সাফল্য এবং দলের জয়ে অবদানের বিচারে ম্যারাডোনা, মেসির পর ডি মারিয়াই সেরা আর্জেন্টাইন ফুটবলার কি না তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
কিংবদন্তি ম্যারাডোনার অবসরের অনেক বছর পর আর একজনকে খুঁজে পায় আর্জেন্টিনার ফুটবল, যার সঙ্গে ম্যারাডোনার তুলনা করা যায়। তিনি লিওনেল মেসি। স্বভাব এবং জীবনযাপনে ম্যারাডোনার ঠিক বিপরীত। মাঠ এবং মাঠের বাইরে নিপাট ভদ্রলোক। তার নামে কোনো কেলেঙ্কারি, কোনো বিতর্ক নেই বললেই চলে। তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর পায়ের জাদুতে সম্মোহিত হলো গোটা দুনিয়া। স্বয়ং ম্যারাডোনা পর্যন্ত মেসিকে নিয়ে মুগ্ধতার কথা বলে বেড়ালেন সর্বত্র। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসে ফুটবল দুনিয়ার কোনো কিছুই জেতার বাকি রইল না মেসির। জাতীয় দলের কোপা আমেরিকা, কোপা ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ সব শিরোপাই ছুঁয়ে দেখলেন। আর মেসির প্রতিটি অর্জনে জড়িয়ে গেল তার সেরা সতীর্থ আনহেল ডি মারিয়ার নাম।
২০২১ কোপা আমেরিকার কথাই ধরুন। বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ব্রাজিলের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। ১-০ গোলের সেই জয়ে ২৮ বছর পর কোনো শিরোপা ঘরে তোলে আকাশি নীল জার্সিধারীরা। ফাইনালে একমাত্র গোলটি করেছিলেন ডি মারিয়া। পরের বছর ফিনালিসিমা ফাইনালে ইতালিকে ৩-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। লাউতারো মার্তিনেজ আর পাওলো দিবালার সঙ্গে গোল করেন ডি মারিয়াও। এরপরই আসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ। লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কাতারের সেই আসরে আর্জেন্টিনার শুরুটা হয়েছিল সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে। কিন্তু কে জানত, সেই আসরেই আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের অপেক্ষার পালা ফুরোতে যাচ্ছে? ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে অগ্নিগর্ভ ফাইনালের মূল সময়ের খেলা ৩-৩ ড্র হলো। মেসির পাশাপাশি গোল করলেন ডি মারিয়া। এরপর টাইব্রেকার আর আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের আনন্দ।
অথচ এই তিন ফাইনালের আগে ‘ফাইনাল’ শব্দটাই যেন ডি মারিয়ার জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে ছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারেননি চোটের জন্য। আর্জেন্টিনা হারল জার্মানির কাছে। চিলির বিপক্ষে ২০১৫ কোপার ফাইনালের প্রথমার্ধে ফের চোটে পড়লেন ডি মারিয়া। দলেরও স্বপ্নভঙ্গ হলো আরও একবার। ২০১৬ কোপায় গ্রুপ পর্বেই তিনি ইনজুরিতে পড়েন। ফাইনালে একাদশে ফিরলেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আবারও হানা দিল ইনজুরি। মাঠ ছাড়লেন ডি মারিয়া। গোলশূন্য ম্যাচ টাইব্রেকারে জিতে চ্যাম্পিয়ন হলো সেই চিলি।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের হয়ে মুদ্রার দুই পিঠই দেখে ফেলেছেন ডি মারিয়া। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। স্কালোনি তাকে বলেছেন, যত দিন ইচ্ছা, খেলে যেতে। কিন্তু ডি মারিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। মাথা উঁচু করেই তিনি বিদায় নিতে চান। ফুটবল মাঠে আর দেখা যাবে না তার রক্ষণচেরা পাস। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস তাকে কোন স্থানে রাখবে, সেটা বলে দেবে সময়। তবে যুগ যুগ ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলে ম্যারাডোনা, মেসির সঙ্গে আরেকটি নাম যদি উচ্চারিত হয়, সম্ভবত সেটি হবে ডি মারিয়ার নামটাই।
