বছর দু-এক আগেই ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অডিটর পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরিন রূপা। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছে থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসে সহায়ক ডিজিটাল ডিভাইস, প্রায় দুই লাখ টাকা ও প্রশ্নপত্রের উত্তরের কপি উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। যখন রূপা গ্রেপ্তার হন, তখন তিনি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। গ্রেপ্তারের দুদিন পর আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দেন। তবে পরে পুলিশের চার্জশিটে এই মামলার অন্য সাত আসামির নাম থাকলেও তার নাম ছিল না। কলেজে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী ও স্বামী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ায় সহজেই পার পেয়ে যান অভিযোগ থেকে।
হাতেনাতে আটক হওয়ার পরেও খুব অল্পদিনেই জামিনে বেরিয়ে এসেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের এই মূলহোতা। যদিও তাকে পদ ও ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি গত উপজেলা নির্বাচনেও একই পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু জয়ী হতে পারেননি। তার মতো অনেকেই জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছেন।
এ বিষয়ে রূপার বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের তার ব্যবহৃত আইফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ফরেনসিক করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই তাকে মামলার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্ন কেলেঙ্কারির আগেও একাধিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৫টি মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্তগুলো চলে গেছে হিমঘরে। এমনকি কোনো কোনো মামলার আসামি জামিনে বের হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনকি এক আসামি উপজেলা চেয়ারম্যান পর্যন্ত ছিলেন। মামলাগুলোর তদন্ত কবে শেষ হবে, তা স্পষ্ট করে বলতে পারছে না তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
গ্রেপ্তারকৃত বিসিএস পরীক্ষাকাণ্ডের খলনায়ক আবেদ আলী কারাগারে থাকলেও, তার বিষয়ে সামনে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। পিএসসির পাশাপাশি তিনি শিক্ষা বোর্ড ও মেডিকেল কলেজের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। গত দশ বছরে এই সেক্টর থেকে তিনি অন্তত ২০ কোটি টাকা কামিয়েছেন বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে।
পাবলিক পরীক্ষাগুলো (অপরাধ) আইন ১৯৮০ অনুযায়ী পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড এবং সর্বোনিম্ন তিন বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে অহরহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা, মামলা, গ্রেপ্তার হলেও পুরোপুরি শাস্তি পাওয়ার নজির নেই বললেই চলে। এর কারণ হিসেবে যুগোপযোগী আইন না থাকা এবং বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এসব অপরাধে লিপ্ত হওয়ার কারণে, নির্দিষ্ট সময়ের পরে সেসবের কোনো প্রমাণ সংরক্ষিত না থাকায় অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধে উৎসাহিত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৮০ সালের যে আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচার করা হয়েছিল, সেটি সংস্কার প্রয়োজন। সে সময়ের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। এই আইনে অনেক কিছুই নেই, যেটি দিয়ে বর্তমান সময়ের অপরাধ প্রমাণ করা যায়। এখন ডিজিটাল ডিভাইস দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। সেসবে প্রমাণ থাকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপর সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ধরপাকড় করে আসামি আদালতে তুললে সেখানে প্রামাণ দিতে হয়। ডিজিটাল ডিভাইসে এসব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কারণে অনেক সময় মামলার তদন্তে ধীরগতি এবং প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ সামর্থ্য না থাকায় কোর্টে আর অপরাধ প্রমাণিত হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যান এবং পরে একই অপরাধে উৎসাহিত হন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১২ বার মেডিকেলের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। পুলিশ ওইসব ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার পরপরই থানায় মামলা হয়েছে। কিছুদিন মামলার তদন্ত হয়েছে। তারপর আর তদন্ত শেষ হয় না। তবে কিছু মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও বেশিরভাগ মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে না।
বছর-তিনেক আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ফেইম কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ডাক্তার ময়েজ উদ্দিন আহমেদ প্রধান, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সোহেলী জামান, প্রাইমেট কোচিং সেন্টারের মালিক ডাক্তার আবু রায়হান, থ্রি-ডক্টরস কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ডা. জেড এম সালেহীন শোভন, মেডিকো ভর্তি কোচিং সেন্টারের মালিক ডাক্তার জোবাইদুর রহমান জনি, জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক ডাক্তার জিল্লুর হাসান রনি, ইমরুল কায়েস হিমেল, জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মুক্তার, রওশন আলী হিমু, ই-হক কোচিং সেন্টারের মালিক আক্তারুজ্জামান তুষার, ফার্মগেটের ইউনিভার্সেল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সহায়তা কেন্দ্রের জহির উদ্দিন আহমেদ বাপ্পী ও টাঙ্গাইলের মিন্টু মেমোরিয়াল হাই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস সরকার। তাদের কয়েক দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছিলেন। চক্রের সদস্যরা এসএসসি, এইচএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এবং বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করত। চক্রের শতাধিক সক্রিয় সদস্য আছে তাদের। হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে অবৈধ উপায়ে মেডিকেল কলেজগুলো ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন সাপ্লাই করে কয়েকশ কোটি টাকা আয় করেছেন।
চক্রের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় মামলা হয়েছে। এখনো ওই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। ২০২৩ সালে ৯ আগস্ট টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও বরিশালে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। থানায় মামলা হলেও তদন্ত নেই বললেই চলে। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ করে দিতে তৎপরতা চালায় একটি চক্র। চক্রের মূলহোতা নয়ন ইসলামকে গ্রেপ্তার করে রাজশাহীর জেলা পুলিশ। তিনি প্রায় ৫ বছর ধরে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক এবং চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্নপত্র দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। চক্রের সদস্য সংখ্যা সাতজনের মতো। বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা হলেও তদন্ত নেই।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সম্পৃক্ত যারা, তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। আমরা কিন্তু কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। তা ছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরনো মামলার তদন্ত শেষ না হলে দ্রুত সময়ে তা শেষ করতে বলা হয়েছে।’
এই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে পুলিশের সব কটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সৈয়দ আবেদ আলী মেডিকেল ও শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। তা ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে দেন। এসব করে তিনি অন্তত ২০ কোটি টাকা আয় করেছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সম্পৃক্ত পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, পিএসসির শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া, দীপক বণিক, খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, গোলাম হামিদুর রহমান, মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, আসলাম, কৌশিক দেবনাথকে আমরা খুঁজছি। তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’
