বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘শতশত প্রাণ গেলেও এ বিষয়ে সরকার কোনো কথা বলছে না। শুধু সরকারি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এ নিয়ে সরকারের উদ্বেগ। সত্য কথা বললে রাষ্ট্রবিরোধী বলা হয়। আসল রাষ্ট্রবিরোধী হলো আওয়ামী লীগ।’ গতকাল বুধবার বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আন্দোলন শেষ হয়নি, অতীতেও হয়নি। ইতিহাস দেখুন, পাকিস্তান আমলে বহুবার আন্দোলন হয়েছে, একপর্যায়ে আন্দোলন হয়তো স্তিমিত হয়েছে, তারপর আবার বেগবান হয়েছে। এবারকার আন্দোলন একটা আই-ওপেনার। মানুষ রাস্তায় নেমেছে।
১৫-১৬ বছরের বাচ্চা ছেলে মায়ের কাছে গিয়ে বলেছে, মানুষ বেরিয়ে এসেছে, আমি আন্দোলনে যাব, ওদের সঙ্গে যেতে হবে।’
ফখরুল বলেন, ‘একদিকে কোটা আন্দোলন, অন্যদিকে সরকারের চরম ব্যর্থতা। দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সে কারণেই এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। সেনাবাহিনী নামিয়ে, দমন-পীড়ন-নির্যাতন-নিপীড়ন করে তারা হয়তো সাময়িকভাবে আন্দোলন থামিয়ে দিতে পারে। রাজনৈতিক সমাধান করতে না পারলে কিন্তু আন্দোলন শেষ হবে না।’
রাজনৈতিক সমাধানটা কী এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রাজনৈতিক সমাধান হচ্ছে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
ফখরুল বলেন, ‘কারফিউ দেওয়ার পর থেকে সরকার প্রমাণ করতে চাইছে, আন্দোলনে বিভিন্ন হত্যার ঘটনা ও ভাঙচুর হয়েছে এবং এর সবকিছুর জন্য দায়ী তারেক রহমান। বোঝা যায়, তারা তারেক রহমানকে হেয়প্রতিপন্ন করে, তার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্নদিকে নিতে বিএনপি ও বিরোধী দলকে দায়ী করছে। সরকারের এ বক্তব্য অমূলক, বিভ্রান্তিকর, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শত শত প্রাণ তারা কেড়ে নিল, এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না। এ ধরনের ঘটনায় কেউ আহত হলে তার চিকিৎসাব্যবস্থার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্দোলনটাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করা। ছাত্রদের দাবি কিন্তু পূরণ হয়নি। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেনি, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথাও বলেনি। তারা সমস্যা তৈরি করে আবার সেই কোর্ট থেকে রায় নিয়ে এসেছে। সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বললে আজ এটা এত দূর গড়াত না। আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগে শত শত মানুষকে হত্যা এবং আর্মি নামিয়ে কারফিউ দেওয়ার মতো ঘটনা কিন্তু আমরা সমসাময়িক সময়ে দেখিনি। কতজন মারা গেছে, কতজন আহত হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার কোনো তথ্য দিচ্ছে না।’
জনগণ যাতে সত্য না জানতে পারে সেজন্য সরকার ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যম বন্ধ করে রেখেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ক্ষমতাসীন শ্রমিক লীগের একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে, তাকে টাকা দেওয়া হয়েছিল বিআরটিসির বাসে আগুন লাগানোর জন্য।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিএনপির সমর্থন ‘এখনো আছে’ জানিয়ে ফখরুল বলেন, ‘তাদের (আন্দোলনকারী) দাবি আট দফা কিন্তু এখনো পূরণ হয়নি। শুধু কোটা নয়, বাকি দাবিগুলোও সরকারের অবশ্যই পূরণ করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এ সরকারের জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের কাছে জবাবদিহিও নেই। ফলে তারা জনগণের চোখের ভাষা বুঝতে পারে না। নির্যাতন-নিপীড়ন করে ক্ষমতায় টিকে থাকা ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। ২০১৪, ২০১৮ সাল, এবারসহ কখনোই কিন্তু আমরা নাশকতায় জড়াইনি, জবরদস্তি কিছু করতে যাইনি। সরকার আক্রমণ করলে বিএনপি প্রতিহতের চেষ্টা করেছে। আমরা আন্দোলন করছি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য। রাজনৈতিক সমাধানের ব্যবস্থা করা না হলে আন্দোলনেরও সমাধান হবে না।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দিন আগে পুলিশ ক্রাইম সিন ফিতে লাগিয়ে দিয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ থাকায় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য পাচ্ছি না। জেনেছি, আমাদের প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাই।’
ফখরুল বলেন, ‘কতজন এ আন্দোলনে মারা গেছে, কতজন আহত হয়েছে এটা তারা (সরকার) জানাচ্ছে না। উদ্দেশ্য হচ্ছে, জাতিকে ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া। আন্দোলনের সঙ্গে থাকা আর নাশকতায় মদদ দেওয়া কী এক জিনিস! নাশকতার মদদ দিচ্ছে তারা (সরকার)। বিএনপির তার চল্লিশ বছরে কোনো রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় আক্রমণ করেনি।’
আন্দোলনে জনসাধারণকে হত্যার ছবি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নেতারা দেখেছেন জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘১৪ আগস্ট অলিম্পিক উদ্বোধন করবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার ভাবমূর্তি বিনষ্ট ও তাকে হেয় করতে সরকার চেষ্টা করছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, সাজাও হয়েছে। সত্য কথা বললেই রাষ্ট্রবিরোধী!’ ফখরুল বলেন, দ্রুত কারফিউ প্রত্যাহার করা উচিত।
