দোকানে যাওয়ার পথে পেটে গুলি লাগে দিনমজুর রিংকুর

  • কোটা আন্দোলনের সহিংসতায় গুরুত্বর আহত হয়েছেন যাত্রাবাড়ি এলাকায় দিনমজুর রিংকু
  • সংঘর্ষ এবং কারফিউ এর মধ্যে তাকে বাঁচাতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পরেন তার আত্মীয়রা
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৪, ০৩:১২ পিএম

রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকায় থাকেন দিনমজুর মোহাম্মদ রিংকু। কোটা আন্দোলনের সহিংসতায় গুরুত্বর আহত হয়েছেন তিনি। গত শনিবার দুপুরে বাসার নিচে নেমেছিলেন প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে। দোকানে যাওয়ার পথে তার পেটে গুলি লাগে।

আহত মোহাম্মদ রিংকুর ছোট ভাই মোহাম্মদ পিংকু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মেইন রোডে ঝামেলা বইলা আমার ভাই গলি দিয়া যাইতেছিল। এর মধ্যেই হুট কইরা একটা গুলি আইসা ওর পেটে হান্দে।’

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মোহাম্মদ রিংকুকে উদ্ধার করে পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায় স্থানীয় মানুষজন। একইসাথে, স্বজনদের কাছেও খবর পৌঁছান তারা।

ভাই পিংকু আরো বলেন, ‘খবর পাইয়া আমরা দৌড়ে হাসপাতালে গেলাম। হেরা ব্যান্ডেজ করাই দিয়া কইলো ভাইরে ওইহানে রাখন যাইবো না। তাড়াতাড়ি মুগদা মেডিক্যালে নিতে হইবো। কিন্তু বাইরে তহন হেবি গেঞ্জাম। ছাত্র পোলাপান পুলিশগো ইটা মারতাছে, পুলিশও গুলি করতাছে।’

এর মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে বের হন তিনি। কিন্তু মুশকিল হয়, গাড়ি খুঁজে পাওয়া। চারিদিকে সংঘর্ষের মধ্যে আবার কারফিউ।

পিংকু বলেন, ‘গেঞ্জাম-গোলাগুলির মধ্যে আবার কারফিউ। কেউই গাড়ি বের করতে চায় না। অ্যাম্বুলেন্সও খালি নাই। এ দিকে, ভাইয়ের পেট দিয়া হমানে রক্ত পড়তেছে।‘

অনেক চেষ্টার পর পুরো এলাকা খুজে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খুঁজে পান তারা। কিন্তু চালককে রাজি করাতে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে তাদের।

তবে এত যুদ্ধ করে আহত মোহাম্মদ রিংকুকে নিয়ে মুগদা হাসপাতালে গিয়েও লাভ হয়নি তার ভাইয়ের। গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পর তারা ঢাকার মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছালেও সেখানে তাকে ভর্তি করানো যায়নি।

পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে ভাই পিংকু বলেন, ‘হাসপাতালে তহন ভিড়। সব আহত মানুষ। এর মধ্যে ডাক্তার ভর্তি নিলো না। গুলি লাগছে শুইনাই কইলো ঢাকা মেডিক্যালে নিয়া যান।’

সেখান থেকে বিভিন্ন এলাকার সংঘর্ষের মাঝেই মহল্লার অলি-গলি দিয়ে এক প্রকার যুদ্ধ করে বিকেলের দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছান তারা।  

গুলিতে আহত দিনমজুর মোহাম্মদ রিংকুকে নিয়ে যখন স্বজনরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান, তখন কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন চিকিৎসকরা।

এমন পরিস্থিতিতে আহত ভাইকে নিয়ে বিপাকে পড়েন পিংকু। তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা রোগী দেইখা কুলাইতে পারে না, এমন অবস্থা। এই ভিড়ের মধ্যে ক্যামনে ভর্তি করামু, সেইডাই ভাবতেছিলাম।’

তবে অনেক চেষ্টার পর সন্ধ্যার দিকে রিংকুকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে সক্ষম হন স্বজনরা। তবে বহু কষ্টের পরে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করালেও আহত রিংকুর জন্য রক্ত জোগাড় করতেও বেগ পেতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।

পিংকু বলেন, ‘ভর্তির পরই ডাক্তার কইলো ভাইরে তাড়াতাড়ি রক্ত দেওন লাগবো তিন ব্যাগ। কিন্তু এই কারফিউয়ের মধ্যে একলগে এত রক্ত কই পামু?’

রক্তের সন্ধানে প্রথমে হাসপাতালের ব্লাডব্যাংক এবং স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের একাধিক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করে রিংকুর পরিবার। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় গ্রুপের রক্ত না পেয়ে শেষমেশ আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন তারা।

অনেক কষ্টের পরে রক্ত পেলেও কারফিউয়ের মধ্যে তাদেরকে কিভাবে হাসপাতালে আনা হবে, সেটি নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে বেশি ভাড়া দিয়ে রক্তদাতাদেরকে হাসপাতালে আনা হয়। সেই রক্ত দিয়েই পার হয় শনিবার রাত।

পিংকুর ভাইকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় আরেক ব্যাগ রক্ত দিয়েছিলেন হাসপাতালে ভর্তি আরেক রোগীর একজন স্বজন।

তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনা শুইনা হেয় লোক কইলো উনার রক্তের লগে ভাইয়ের রক্তের মিল। আমরা কইলাম, আলহামদুলিল্লাহ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত