ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একশ বছরের ইতিহাস সংগ্রামের, অগ্রগামিতার ও গৌরবের। কিন্তু কোনো ইতিহাসই সরল রেখায় এগোয় না, ছেদ-বিচ্ছেদ ঘটে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, এমনও ঘটনা ঘটেছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়টি টিকতে পারবে কিনা তা নিয়েই সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিককালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেই হয়তো এত প্রতিবন্ধক হটিয়ে সামনে এগোতে হয়নি। আবার সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে দায়িত্ব পালন করেছে তাও অসামান্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন ও গৌরবকে স্মরণ করার সময় ওইসব বাধাবিঘ্ন ও দায়-দায়িত্বকে বিস্মৃত হলে চলবে না। সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ইতিহাসের ভেতর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তার অগ্রগমন অব্যাহত রাখতে হয়েছে। প্রতিবন্ধকতা ভেতর থেকে তেমন আসেনি, যেমনটা এসেছে বাইরে থেকে। রাষ্ট্র বিরূপ ছিল, সমাজও যে অনুকূল ছিল তা নয়।
আপাত-বিবেচনায় সমাজের পক্ষে বিরূপ হওয়ার কথা নয়। অবহেলিত, প্রান্তিক, অনগ্রসর বাংলা প্রদেশে দ্বিতীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা তো সুখবরই হওয়ার কথা; কিন্তু সমাজের সব মহল ঘটনাটিকে সেভাবে নেয়নি। এর কারণ সাম্প্রদায়িকতা। অগ্রসর হিন্দু সমাজের একাংশ মুসলমান-প্রধান পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিল। বস্তুত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনটি শুরুতে যেমন অভিন্ন বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করেছে, পরবর্তী সময় তেমনটা পারেনি; সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যে ‘বন্দেমাতরম’ রণধ্বনি হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণদের উজ্জীবিত করেছিল, সেটাই বিভাজনের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ধ্বনির অন্তর্গত হিন্দু মাতৃমূর্তির ধারণাটিকে মুসলিম সম্প্রদায় গ্রহণে অসম্মত হয়েছে। এবং পরে ১৯১১-এর শেষে যখন বঙ্গভঙ্গ রদ হলো তখন পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় হতাশ হয়েছে; কারণ নতুন প্রদেশে তাদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটবে, এমন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল বৈকি। ওদিকে ১৯০৬ সালে ঢাকাতেই নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নামে মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়ে গেছে এবং ইংরেজ সরকার পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা কায়েম করে দুই সম্প্রদায়ের ভেতর স্বার্থগত স্বপ্নের বিভাজনকে নতুন গভীরতায় নিয়ে গেছে। এরই পাশাপাশি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকারীদের শাস্তি দেওয়ার অভিলাষে ভারতবর্ষের রাজধানীকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়কে মোটেই সন্তুষ্ট করেনি। এভাবে সব দিক থেকেই জাতীয়তাবাদী স্বদেশি আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। গান্ধীজি এসে এক বছরের মধ্যে স্বরাজ আনবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে দিয়েছিলেন এবং যাতে তিনি খেলাফতপন্থিদেরও সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন, সে-আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার দরুন বড় রকমের হতাশা দেখা দেয়। এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ার প্রচেষ্টাটি ভেঙে যাওয়ার ফলস্বরূপ হতাশার ও ব্যর্থতা বোধের ভেতর থেকে উল্টো সাম্প্রদায়িকতাই নতুন শক্তি অর্জন করতে পেরেছিল। বলা বাহুল্য ইংরেজরা এই বিরোধের বিকাশে সমানে উৎসাহ জোগাচ্ছিল।
এ রকমের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এবং সেটা ঘটেছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের দাবির মুখে। তারা চাইছিলেন বঙ্গভঙ্গ রদ করার ক্ষতিপূরণ (কমপেনসেশন) হিসেবে ঢাকায় অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক। ইংরেজরা তাতে সায় দিচ্ছে দেখে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের খুশি হওয়ার কথা নয়; সেটা তারা হনওনি। তাদের মনে হয়েছিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধিতে ব্যর্থ হয়ে সরকার নতুন এক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঘটানোর চেষ্টা চলবে।
রমেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার অধ্যাপকদের একজন এবং পরবর্তী সময় তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পান। তিনি স্মরণ করেছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজের একাংশের পক্ষ থেকে বেশ জোরালো আপত্তি উঠেছিল। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, ‘তাদের আপত্তির প্রধান কারণ ছিল যে, এর ফলে রাজনৈতিক ভাগের পরিবর্তে বাংলাদেশকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে দুই ভাগ করা হবে।’ একই কারণে কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের কয়েকজন খ্যাতিবান প্রতিনিধি বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে দেখা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাতিল করার দাবি জানিয়েছিলেন। আপত্তি উঠেছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকেও। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ওই বিশ্ববিদ্যালয় চায়নি তার একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্য খ-িত হোক। এই আপত্তির ভেতরও সাম্প্রদায়িকতার উপাদান যে ছিল না তা নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল হিন্দু মধ্যবিত্তের অনেকটা একচ্ছত্র আধিপত্য, তাদের আপত্তিটাকে তাই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ ছিল বৈকি।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে ইংরেজদের যে আগ্রহ ছিল তা মোটেই নয়। বাংলায় উচ্চশিক্ষার বিস্তারে তারা উদ্বিগ্নই ছিল, কারণ তারা টের পাচ্ছিল যে, এর দরুণ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে জেগে উঠছে তাদের অসন্তোষ। নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ওই অসন্তোষকে আরও উৎসাহ দেবে এমন অভিপ্রায় তাদের ছিল না। তবে অসন্তুষ্ট মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবির মুখে ওই সম্প্রদায়কে কিছুটা ছাড় দেওয়ার ইচ্ছাতেই তারা সম্মত হয়েছিল ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে। ছাড় (কনসেশন) শব্দটা তারা ব্যবহারও করেছে। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যে মধ্যবিত্তের ভেতর হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে এগিয়ে নেবে এমন আশাও তাদের ছিল বৈকি। বস্তুত ওই আশাটি ছিল ইংরেজ শাসনের সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই অংশ। জনসংখ্যার হিসাববিবরণী প্রস্তুতের (সেনসাসের) শুরুতেই তারা হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্যদের আলাদা করে দেখিয়েছে; ভারতের ইতিহাসকেও হিন্দু যুগ ও মুসলমান যুগ হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেছে। প্রথম দিকে তাদের বিশেষ রকমের বিদ্বেষ ছিল মুসলমানদের প্রতি, কারণ মুসলমান শাসকদের কাছ থেকেই তারা রাজ্যশাসন ছিনিয়ে নিয়েছিল। পরে ১৮৫৭-তে যে সিপাহি অভ্যুত্থান ঘটে তাতে হিন্দু-মুসলিমের মারমুখী ঐক্য লক্ষ করে তারা একদিকে যেমন প্রমাদ গুনেছিল, অপরদিকে তেমনি তাতে নবগঠিত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অনুপস্থিতি দেখে কিছুটা সন্তুষ্টও হয়েছিল। তাদের শঙ্কা ছিল, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যদি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হয় তাহলে পরবর্তী অভ্যুত্থানটি হয়তো ফরাসি বিপ্লবের মতোই ভয়ংকর ঘটনায় পরিণত হবে। মধ্যবিত্তকে তাই আলাদা করা চাই; তাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্য একটা প্রকাশমুখ খোলাও দরকার। এই বোধ থেকেই তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গঠনকে উৎসাহিত করে এবং পরবর্তী সময় যখন দেখে যে খুব একটা কাজ হচ্ছে না, কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদন নীতিতে মধ্যবিত্তের বিক্ষুব্ধ অংশ সন্তুষ্ট নয়; তখন তারা বঙ্গভঙ্গ, মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দান, পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা ইত্যাদি বিভেদাত্মক চতুর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বঙ্গভূমিই যেহেতু ইংরেজবিরোধী তৎপরতার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, বাংলাকে তাই ভাগ করা এবং পরে ভাগ যখন রদ করতে হলো তখন শাস্তিস্বরূপ তো বটেই, আন্দোলনকে দুর্বল করার অভিলাষেও রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেল দিল্লিতে। হিন্দু সমাজের প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকে ওইসব পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা হিসেবেই গণ্য করেছিলেন। তারা নিজেদের সম্প্রদায়গত স্বার্থকেই বড় করে দেখেছেন, সমগ্র বঙ্গের সামাজিক অগ্রগতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য ভূমিকাকে বিবেচনার ভেতর না নিয়ে।
রমেশচন্দ্র মজুমদার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ভেতর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপত্তির যে কারণটির কথা বলেছেন সেটিকেই আরও পরিষ্কারভাবে পাওয়া যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন সাবেক ছাত্রের লেখাতে। রমেশ মজুমদারের লেখাটি আছে আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামের একটি সঙ্কলনে, অপর লেখাটিও রয়েছে একই বইতে। লেখক অনাথবন্ধু বেদজ্ঞ বলছেন যে, ১৯১১-তে এসে বঙ্গভঙ্গকামী শাসকগোষ্ঠী পথ পরিবর্তন করেছে মাত্র, মত পরিবর্তন করেনি। ‘হিন্দু-মুসলমান মিলন তাদের রাত্রির নিদ্রা হরণ করল। তাই তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কর্মসূচি তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ। মন্দির ও মসজিদে পূজায় ও নামাজ আচরণে ও প্রকরণে এই দুই জাতি যে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ইহা সঙ্কীর্ণতাবাদী, ধর্মীয় গোঁড়ামি দ্বারা আচ্ছন্নবুদ্ধি লোকদের দ্বারা প্রবলভাবে প্রচারিত হতে লাগল।’ এই লেখকের মতে, ওই কর্মসূচিরই একটি অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। নিজের অজান্তেই হবে, অনাথবন্ধু বেদজ্ঞ বলছেন যে, বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান এক জাতি নয়, দুটি পৃথক জাতি। শাসক ইংরেজেরও কিন্তু বড় একটা ভরসা ছিল সম্প্রদায়কে জাতি হিসেবে চিহ্নিত করার ওপরই।
তবে বিভাজনবৃদ্ধির সন্দেহটা যে নীরব ছিল তা নয়। কলকাতায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যেভাবে বড়লাটের কাছে সশরীরে গিয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ‘অন্যায়’ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন, অকুস্থল ঢাকাতে তা আরও সংগঠিত রূপ নিয়েছিল। অনাথবন্ধু বেদজ্ঞ জানাচ্ছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রতিবাদে ঢাকায় জনসভা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। সদরঘাটের করোনেশন পার্কের এক জনসভায় ঢাকা শহরের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত একজন আইনজীবী বলেন, ‘প্রারম্ভে এর আড়ম্বর ও জাঁকজমক দেখে মনে হলো এটা একটা Pucca University, কিছুদিনের মধ্যে মনে হলো এটা একটা Mecca University, তারপর বর্তমান উপলব্ধি এটা একটা ফাক্কা University, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিহাস করে Mecca of the East বলা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। নিজের সাধনায় ও যোগ্যতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য প্রমাণ করেছে যে, এটি পাক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠেছিল।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
