মতবিনিময় সভা রূপ নিল ক্ষোভ প্রকাশের সভায়

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৪, ০২:২৯ এএম

আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের আড়ালে-আবডালের ক্ষোভ-বিক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কোটা আন্দোলন ঘিরে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে জমাটবাঁধা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে দেখা গেছে গতকাল বুধবার। এ দিন ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মতবিনিময় সভা ছিল। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দোতলার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভা রূপ নেয় গালমন্দ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রকাশের সভায়। তোপের মুখে পড়েন সভার সভাপতি ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

সম্প্রতি কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা-পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরামর্শ করতেই মূলত ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

বেলা ১১টার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অনুষ্ঠানস্থলে ঢোকেন। ঢুকেই সাবেক ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় না করেই যথারীতি বক্তব্য শুরু করেন ওবায়দুল কাদের। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন উপস্থিত কয়েকশ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তখনো দেখানো শুরু হয়নি। অনুষ্ঠানের শুরুতে মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতাদের চায়ের আপ্যায়ন শুরু হলে প্রথম দফায় ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। তবে আওয়াজ ছিল নিচু। মৃদু আওয়াজেই বলতে থাকেন ‘আমাদের চা কই? শুধু তারাই খাবে?’ এরই মধ্যে এই আওয়াজও আসতে থাকে ‘বক্তব্য অনেক দিয়েছেন, আজকে বক্তব্য শুনতে আসিনি। এত দিন আপনারা বক্তব্য রেখেছেন, শুনেছি। এখন আমাদের কথাও শুনতে হবে। শুনুন।’ তখনো সাবেক ছাত্রনেতাদের সবাই যুক্ত হননি প্রতিবাদে।

ওবায়দুল কাদের যখন বলতে শুরু করেন, ‘এখন দুঃসময়। এই দুঃসময়ে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে...।’ তখনই ফুঁসে ওঠে পুরো মিলনায়তন। একে একে সবার কণ্ঠস্বরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝরে পড়ে। তারা বলেন, ‘শুধু দুঃসময়ে ডাকবেন। সুসময়ে ভাই-ভাতিজা, শালা-বোনজামাই ও প্রটোকল বাহিনীকে মূল্যায়ন করবেন?’ গালমন্দ করেও ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতারা। সেই পরিস্থিতি আর সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। বক্তব্য শেষ না করেই মঞ্চ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলের একাধিক নেতা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে তারা স্বীকার করেন। তারা বলেন, গত ১৫ বছরে দলের মধ্যে বঞ্চিতদের সংখ্যা বেড়েছে। তাদের সবাই দুর্দিনের নেতাকর্মী। মূল্যায়ন হয়নি তাদের এ অভিযোগ মিথ্যা নয়। সুতরাং তাদের অভিযোগ সবার মাথা পেতে নেওয়া উচিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ নেতারা আরও বলেন, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটবে। তবে কোনো কিছুই অতিরঞ্জিত করা যাবে না।

আওয়ামী লীগের অপর একটি অংশ দাবি করে, কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তাতে করে অনেক নেতা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলেও এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ মতে, ১১টার পরে শুরু হওয়া মতবিনিময় সভার প্রথম দিকেই মিলনায়তনের পরিবেশ অন্যদিনের চেয়ে একটু ভিন্ন ছিল। মিলনায়তনে উপস্থিত সাবেক ছাত্রনেতারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতাদের সমালোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। শোরগোল করছিলেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক মাইক হাতে নিয়ে শোরগোল থামানোর চেষ্টা করেন। পরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও চেষ্টা করেন। তাতেও কাজ হয়নি। এরই মধ্যে, ওবায়দুল কাদের মাইক নিয়ে বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্য শুরুর পাঁচ-সাত মিনিট বক্তব্য দেওয়ার পর কাদের বলেন, সুসময়ের কথা বলে এখন লাভ নেই। দুঃসময়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তার এমন আহ্বান শেষ হতে না হতেই সাবেক নেতাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

উপস্থিত সাবেক নেতারা উচ্চ স্বরে বলতে থাকেন, ‘এসি রুমে বসে থাকেন, দুঃসময়ের নেতাকর্মীদের চেনেন না, মূল্যায়ন করেন না। দুঃসময়ে আর কত থাকব?’ এই ক্ষোভ শুরু করেন পাঁচ-সাতজন। পরে ছড়িয়ে পড়ে সারা মিলনায়তনে। চারপাশ থেকে সাবেক ছাত্রনেতারা দাঁড়িয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ওবায়দুল কাদেরকে লক্ষ করে ‘ভুয়া’ ‘ভুয়া’ স্লোগানও দেওয়া হয়। কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতা তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন, ‘মতবিনিময় সভা ডেকে সংবাদ সম্মেলন করছেন। তাহলে আমাদের ডাকলেন কেন? আগে আমাদের কথা শুনবেন, আলোচনা করবেন, তারপর ব্রিফ করেন। তা না করে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলা শুরু করে দিলেন...।’

ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেকেছেন মতবিনিময় সভা করবেন। তা না করে উনি কেতাবি বক্তব্য শুরু করে দিলেন। আরে ভাই, বক্তব্য অনেক শুনেছি, আর কত!’

এমন পরিস্থিতিতে নানক, নাছিমসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে মিলনায়তনের মঞ্চ ছেড়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সাততলায় নিজ কার্যালয়ে চলে যেতে বাধ্য হন ওবায়দুল কাদের।

উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, হট্টগোল শুরু হলে সংবাদ সম্মেলন অন্যান্য দিনের মতো দীর্ঘ না করে সভাস্থল ত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এ সময় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের নিচতলা ও সামনের সড়কে থাকা ছাত্রলীগের সাবেক নেতারাও ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া স্লোগান দিতেন, যা নেতাকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।

এদিন ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মতবিনিময় সভায় আসা ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতা সাংবাদিকদের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

পরে মঞ্চে থাকা দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাকের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ছাত্রলীগের সাবেক বেশ কয়েকজন নেতা। তার ছেলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘আপনি এখানে কেন?’

চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাকের ছেলে ও নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক স্ট্যাটাস দেন, যা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

ড. রাজ্জাককে উদ্দেশ্য করে কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতা উচ্চ স্বরে বলে ওঠেন, ‘আপনি এখানে কেন এসেছেন? আপনার ছেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী পোস্ট দিয়েছেন কেন?’ আবদুর রাজ্জাক সভাস্থল ত্যাগ করার সময় ঘিরে ধরে আবার ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাবেক আরও কয়েকজন ছাত্রনেতা। দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন আবদুর রাজ্জাকও।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আজকে আমাদের লড়তে হবে একসঙ্গে। মান-অভিমান সব ভুলে যেতে হবে।’

অশুভ শক্তি, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রবিরোধীদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। শেখ হাসিনাই এই মুহূর্তে আমাদের অস্তিত্বের কান্ডারি। আগুন-সন্ত্রাসের ধ্বংসলীলা আবার শুরু হয়েছে।’

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, আফজাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত