মাঠে থাকার ঘোষণা মুক্তি পাওয়া সমন্বয়কদের

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৪, ০৮:০২ এএম

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ দুই সমন্বয়ক। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজ নিজ ফেসবুকে অ্যাকাউন্টে দেওয়া স্ট্যাটাসে এ ঘোষণা দেন সারজিস আলম ও হাসনাত মাহমুদ। এর আগে গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ঢাকা মহানগর ডিবি কার্যালয় থেকে সংস্থাটির গাড়িতে সারজিস ও হাসনাতসহ ছয় সমন্বয়ককে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

সারজিস ও হাসনাত ছাড়া গতকাল ডিবি কার্যালয় থেকে ছাড়া পাওয়া অন্য সমন্বয়করা হলেন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের ও নুসরাত তাবাসসুম। গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে নাহিদ, আসিফ ও বাকেরকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। তারা তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সেদিন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান (সদ্য বদলি হওয়া) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে।

এরপর গত শনিবার সন্ধ্যায় সারজিস ও হাসনাত এবং রবিবার ভোরে নুসরাতকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে থাকাবস্থায় গত রবিবার এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন এ ছয় সমন্বয়ক। তবে তাদের দিয়ে জোর করে এ ঘোষণা দেওয়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন অন্য সমন্বয়করা।

গতকাল ছয় সমন্বয়ককে ডিবি থেকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘তারা (সমন্বয়করা) আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিল। এ ব্যাপারে জিডিও করা হয়েছিল। এখন তারা বলেছেন, তাদের আর নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই, যখন তারা চলে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, চলে যেতে আমরা কোনো বাধা দিইনি। তারা চলে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য ছয়জনকে (সমন্বয়ক) যে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়েছে, সেটাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট ডিভিশনে একটা মামলা করা হয়েছিল। হাইকোর্টে মামলাটি চলাকালে শুনেছি যে একজন বিচারপতি তিনি অসুস্থ হিসেবে ছুটি নিয়েছেন। ওই বিচারক ছুটিতে থাকায় সেই মামলাটির শুনানি আজও (গতকাল) হবে না।’

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের বাবা বদরুল ইসলাম জানান, গতকাল ভোর ৬টার দিকে সমন্বয়কদের পরিবারকে ফোন করে ডিবি কার্যালয়ে যেতে বলা হয়। পরে ছয় সমন্বয়কের স্বজনরা সেখানে যান। দুপুরের দিকে সংস্থাটির কালো রঙের একটি গাড়িতে করে স্বজনসহ তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা সারজিস ও হাসনাতের : গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফেসবুকে স্ট্যাটাসে সারজিস আলম এবং হাসনাত মাহমুদ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তবে এর কিছুক্ষণ পরই তাদের ফেসবুক আইডি উধাও হয়ে যায়।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে সারজিস বলেন, ‘এ পথ সত্যের, ন্যায়ের পথ, তাই যেকোনো কিছু মোকাবিলা করতে আমরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। যতদিন না এ বাংলাদেশ আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে, গণগ্রেপ্তার, জুলুম, নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে; ততদিন লড়াই চলবে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘কথা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করবেন না, মামলা দিয়ে হয়রানি করবেন না। আপনারা কথা রাখেননি। আপনারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর আঘাত করেছেন। সারা দেশে স্কুল-কলেজের ভাইবোনদের ওপর লাঠিচার্জ করেছেন। যাকে ইচ্ছা তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। আন্দোলনকারীকে খুঁজে না পেলে বাসা থেকে ভাইকে তুলে নিয়েছেন, বাবাকে হুমকি দিয়েছেন, মাশরুর তার উদাহরণ।’

ডিবি হেফাজতের বিষয়ে এ সমন্বয়ক বলেন, ‘ছয় দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ছয়জনকে আটকে রাখা যায় কিন্তু এই বাংলাদেশের পুরো তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন প্রতিনিয়ত; সেগুলো কীভাবে নিবৃত্ত করবেন?’

হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে দেওয়া তার স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেউই মুক্ত নই। এই গণগ্রেপ্তার গণঘৃণার নামান্তর। আমাদের মুক্তি তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটিও মুক্তি পাবেন। এই গণগ্রেপ্তার কেবল নিরপরাধ মানুষের অধিকার হরণ নয়, বরং আমাদের সমগ্র সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন। এটি মুক্তচিন্তা ও মানবাধিকারের প্রতি এক ভয়ানক আঘাত। আমাদের এ আন্দোলন শুধুমাত্র ব্যক্তির মুক্তির জন্য নয়, বরং বৈষম্য, নিপীড়ন, গণগ্রেপ্তার এবং ছাত্র নির্যাতনের বিরুদ্ধে। এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’

এদিকে ছয় সমন্বয়ক ৩২ ঘণ্টা অনশনে ছিলেন বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল মতিন পীতম। গতকাল ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘ডিবি হেফাজতে বন্দি ছয় সমন্বয়ক ৩২ ঘণ্টা ধরে অনশনে। আমি ভাবতাম তোরা নজরুল পড়িসনি! কত ভুল ভাবতাম রে! তোরাই তো একেকটা নজরুল! ৩৯ দিনের অনশনে নজরুল একাই ব্রিটিশ রাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন! তোরা তো অগুনতি নজরুল! কে ঠেকায় তোদের! উহারা কজন, তোরা অগণন! সকল শক্তিধারী!’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত