ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অনেকটাই অভিভাবকশূন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। নিরাপত্তা শঙ্কায় পরিচালকরাও আসছেন না মিরপুর শেরে বাংলায়। সেই সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যেও দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। নতুন করে তারা সাজাতে চান ক্রিকেট বোর্ড। এবার সেই আলোচনায় যোগ দিয়েছেন খালেদ মাসুদ পাইলটও।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও কোচ পাইলট দাবি করেন, বর্তমান বোর্ড ১৫ বছর সময় পেয়েছিল। কিন্তু ক্রিকেটের কোনো উন্নতি হয়নি। দুটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হাতে বিসিবি জিম্মি ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আগামী দিনে ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ড নেই এমন মানুষদের ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না রাখার পক্ষেও মত দেন সাবেক এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে পরিচালকরা না আসায় ক্রিকেট বোর্ড অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। তবে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে পাইলট বলেছেন, ‘আমার কাছে মনে হয় এখন তো বিসিবিতে ম্যানেজমেন্ট আছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দায়িত্ব পালন করছেন। এ রকম মুহূর্ত সিইও চালান। ক্রিকেট বোর্ড তো আর ভাঙতে পারবে না। এটার গঠনতন্ত্র হচ্ছে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন আর প্রত্যেকটা বিভাগের যে ব্যবস্থাপক আছে তারা সেগুলো পরিচালনা করবেন।’
তারপরই পাইলটের কণ্ঠে আফসোসের সুর। বললেন, ‘এই বোর্ড কিন্তু ১৫ বছরের মতো সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ক্রিকেটকে সেভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি। নতুন কেউ আসতে পারে না, আবার অনেক সিনিয়র ক্রিকেটার আছে যাদের আর সুযোগ দেওয়া হয়নি তেমন। অকালেই ঝরে গেছে। কেউ কেউ তো যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে গিয়ে থিতু হয়েছেন। শুধু জুনিয়রদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা যদি খেলার জন্য পরিণত না হয় তাহলে তাদের কেন নেওয়া হলো! তারা শুধু বলেছে যে ভবিষ্যতের দিকে চিন্তা করছে সে ভবিষ্যৎটা কখন হবে! ক্রিকেট বোর্ডের সেই সংস্কৃতিটাই গড়ে ওঠেনি।’
তিনি দাবি করেন তৃণমূল স্তরটা এক সময় বেশ গোছানো ছিল। কিন্তু সেটাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে নেই কোনো প্রতিযোগিতা, ‘দুটো প্রতিষ্ঠানের কাছে এই প্রতিযোগিতাটা জিম্মি ছিল। বেক্সিমকো আর গাজী গ্রুপ ছাড়া আর কেউ দাঁড়াতেই পারে না। বেক্সিমকোর মালিকানায় আছে ৫৩টা ক্লাব। একটা মালিকের অধীনে যদি এতগুলো দল থাকে তাহলে পুরো সিস্টেমটাই নষ্ট ছিল। আম্পায়ার নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে এ সময়। খেলার মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। আগে ক্লাব মালিকরা কোন ক্রিকেটার নেবে, কোন কোচ নেবে এসব নিয়ে গবেষণা করত রীতিমতো। কিন্তু এখন সেটা নিয়ে তারা ভাবতই না। ক্রিকেটারদের মধ্যেও ছিল না কোনো প্রতিযোগিতার মনোভাব। শুধু শুধু সময় নষ্ট করা হতো এই লিগ দিয়ে।’
বিসিবিতে এতদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর একটা দাপট ছিল। সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনসহ, পরিচালক নাঈমুর রহমান দুর্জয়, আ জ ম নাসির উদ্দিন ও শফিউল আলম চৌধুরীরা ছিলেন সদ্যবিলুপ্ত হওয়া সংসদের সদস্য। ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ড নেই এমন লোকদের বোর্ডে না রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন পাইলট।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেছেন, ‘এই বোর্ডটা পাপন ভাইয়ের ওপর নির্ভর ছিল পুরোটা। এখন ক্রিকেটটাকে উদ্ধার করে যারা ভালো মানুষ আছেন যাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্রিকেট আছে তাদের দিতে হবে। এখন ৬টা বিভাগের যে ৮ জন আছেন তাদের মধ্যে ৭ জনের ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তারা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। রংপুরের যিনি উনি কোনোদিন ক্রিকেট খেলেননি, তাই আমার মত, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের এখানে না আসাই ভালো।’
বোর্ডে কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও ওখানে সম্মান পাওয়া যেত না বলে দাবি করেন তিনি, ‘আমি অপছন্দ করি দুর্নীতি। ক্রিকেট বোর্ডে অনেক অনিয়ম আছে আমার মনে চায় না এখানে কাজ করি। আমাদের মতো মানুষজন স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই, মাথা উঁচু করে কাজ করব। অনেকে আমাদের বোর্ডে কাজ করেছেন বিগত দিনগুলোতে, কিন্তু মাথা নিচু করে যা বলছে তাই শুনছি।’
সুযোগ পেলে কাজ করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ইচ্ছা আছে যদি সুন্দর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যেমন আমাদের একটা সরকার হচ্ছে ভালো ভালো মানুষগুলো আসছে। ক্রিকেট বোর্ডে যদি এমন সৎ ও ভালো মানুষ আসেন, তবে অবশ্যই কাজ করব। কেন করব না। দেশের জন্য কাজ করতে বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে পারব। ক্রিকেট বোর্ডে গেলে তো অনেক বড় পরিসরে কাজ করা যায়।’