সামনের দিনগুলোতে কী কী চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে সেটা মাথায় নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে চায় মানুষ। বাজারে পণ্যের দামে লাগাম টানাও জরুরি। তা না হলে মানুষের কষ্ট লাঘব হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো আরেকটি বড় কাজ নতুন সরকারের। এরপর অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আর সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরেরও নিশ্চয়তা চায় রাজনৈতিক দলগুলো।
নতুন সরকারে দায়িত্ব পেয়েছেন যারা, তাদের মধ্যে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার, শিক্ষা, আইন, নির্বাচন, পরিবেশ খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন নবীন দুজন, যারা ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
উপদেষ্টারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেছেন উল্লেখ করে সাবেক সচিব আবুল আলম মো. শহিদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। কিন্তু এ সরকারের কোনো বিকল্প ছিল না। তাই এ সরকারের ওপর আমাদের আস্থা রাখতে হবে। দিনের পর দিন তো অস্থির পরিস্থিতি চলবে না। ছাত্ররা তো রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। শিক্ষালয়ে তাদের ফেরত যেতে হবে। তাই রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, তাদের কাজে লেগে যেতে হবে।’
টানা চারবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে সব খাতেই তাদের আধিপত্যগুলো রয়ে গেছে। একইভাবে দেশ-বিদেশি ঋণ বা আর্থিক সহযোগিতায় ছোট-বড়, বিভিন্ন মেয়াদি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে গত কয়েক দিন আন্দোলন এবং একরকমের হঠাৎ সরকার পতনের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। একইভাবে ব্যাংকসহ আর্থিক খাতও নাজুক। অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং অর্থনৈতিক সংকট নতুন করে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ভারসাম্য রক্ষা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দেশে শান্তি ফেরানো। এরপর ব্যাংক খাত গতিশীল করতে হবে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রেখে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসন ঢেলে সাজানো, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, বন্দর স্বাভাবিক করার মতো চ্যালেঞ্জ উতরাতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বড় চ্যালেঞ্জ : সরকার পতনের পরই প্রথমে ঢাকার প্রায় সব থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা সরে যান। এর মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে থানাগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে দেশ জুড়ে ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার সুযোগ নেই। গতকাল পুলিশ তাদের কাজে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে একটা ভয় বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, প্রথমে পুলিশকে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার পুলিশকে দিয়ে জনগণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছিল। আবার এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনগণের মধ্যে আস্থা সংকট। ফলে এখানে দুপক্ষের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে হবে।’
শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা : এক মাসেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। আর আন্দোলন নিষ্ক্রিয় করতে বন্ধ করে দেওয়া হয় সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও। কোটা আন্দোলন ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি, গ্রেপ্তারের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তারা। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। অনিশ্চয়তায় পড়েছে সাড়ে ১৪ লাখ শিক্ষার্থী।
কূটনৈতিক তৎপরতায় নজর : শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক মহল এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা দূতাবাসের কর্মকর্তারাও আতঙ্কগ্রস্ত। কেউ কেউ দূতাবাস আপাতত বন্ধ রেখেছেন। দেশগুলো নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানালেও সম্পর্ক অব্যাহত রাখা এবং দূতাবাসগুলোর স্বাভাবিক কর্মকান্ড চালানো নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ঢাকায় দূতাবাসগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তবে নতুন সরকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা তৌহিদ হাসান বলেছেন, বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র সংস্কার দরকার : সাবেক সচিব আবুল আলম মো. শহিদ খান বলেন, ‘এ আন্দোলন তো শেষ পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনে থাকেনি। রাষ্ট্র মেরামতের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও রাষ্ট্রযন্ত্র যন্ত্রই রয়ে গেছে। এটা কখনো মানবিক হয়নি। এখন এ যন্ত্রটাকে মানবিক ও গণতান্ত্রিক করার সময় এসেছে। ৫৩ বছরে কেউ কিন্তু এ সুযোগ পায়নি। এ সুযোগটা বর্তমান সরকারের আছে। অনেক কিছুতে তাদের হাত দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় নীতি, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ, প্রয়োজনে সেনাবাহিনীতে রিফর্ম করতে হবে। সাংবিধানিক যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে সেগুলোও সংস্কার বা সংশোধন করতে হবে। কিছু কিছু বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা এ সরকারের দায়িত্ব। এর মধ্য দিয়ে একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা, যার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার পরিচালনার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এমন কোনো সরকার চাই না যে, আবার একটা ফ্যাসিবাদী সরকারে রূপান্তরিত হবে।’
আবুল আলম মো. শহিদ খান বলেন, ‘সংবিধানে এক ব্যক্তির কাছে এত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তাতে ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংস্কার প্রয়োজন। কারণ এসব দলের সভাপতি যা বলবেন এটাই তাদের নীতি। গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। দলগুলোর মধ্য যদি গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকে, তাহলে ক্ষমতায় গেলে তাদের কাছ থেকে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও মূল্যবোধ প্রত্যাশা করার কোনো কারণ নেই। এরপর একটা মাঠ প্রস্তুত করতে হবে। যেখানে নাগরিকরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রূপান্তর দরকার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পরিবর্তন দরকার। এটা কার্যকর করা কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের। সুতারং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ হচ্ছে এরকম একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা। গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলো নিয়ে সবার মধ্যে সমঝোতার জায়গা তৈরি করা, যেগুলো আগামীতে নির্বাচিত সরকার কার্যকর করবে। ওনারা (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) যদি দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে চান, সেটা নতুন সংকট তৈরি করবে। সুতরাং প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আগেই বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি : এর মধ্যে আন্দোলনের মাঠ থেকে রাজনৈতিক সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারা ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব কাজ করতে কতটা সময় লাগবে তা বলা যাচ্ছে না। আবার এর মধ্যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ থাকবে নির্বাচন করার ব্যাপারে। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এই মুহূর্তে এ সরকারের জরুরি কাজ হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া। এর মধ্যে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, শান্তি রক্ষার ব্যবস্থা করা। যে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে সেগুলো গড়ে তোলা। আরেকটা জরুরি কাজ হচ্ছে, যারা নিহত ও আহত হয়েছেন তাদের তালিকা করা। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা, আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।’ পাশাপাশি তিনি সব রাজনৈতিক দলকে একটি সমঝোতায় আসার পরামর্শও দিয়েছেন, যাতে আগামীতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই ক্ষমতায় আসবে সেই সমঝোতা বাস্তবায়ন করবে, যেন আগের মতো অবস্থা না হয়।
