৯ আগস্ট রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন গবেষক, লেখক সালেক খোকন। তিনি লিখেছিলেন, গতকালের ঘটনা। মিরপুর এক নম্বর থেকে চৌদ্দ নম্বর পর্যন্ত কোনো বাসের জটলা পেলাম না। কেন? ট্রাফিক পুলিশ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরাই পথে নেমেছে। তারা ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্ব পালন করছে দারুণ দায়িত্বের সঙ্গে। বেশ সুশৃঙ্খলভাবে চলছিল যানবাহন। বাড়ি ফিরতে তাই সময়ও অনেক কম লেগেছে। যে বাসটায় ছিলাম সেটি হঠাৎ থেমে গেল। ভেতর থেকে তাকিয়ে দেখি ইশারা দিয়ে দুই শিক্ষার্থী এগিয়ে আসছে। কী হলো আবার! বাসটির সামনে মহিলা সিটে বসা এক লোক। তারা এসে বিনয়ের সঙ্গে বলল, মহিলা সিটে কেন বসেছেন, আপনি কি মহিলা? জিহ্বায় কামড় দিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে লোকটি পেছনের সিটে গিয়ে বসলেন। ঘটনাটি মনে দাগ কেটে আছে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিলে ৫ আগস্ট সরকারপ্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপর দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের পুলিশ নির্দিষ্ট কিছু দাবির ভিত্তিতে কর্মবিরতিতে যায়। পুলিশের একটি শাখা ট্রাফিক পুলিশও এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে কর্মবিরতি নেয়। পরদিনই সব সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান খোলা থাকার নির্দেশের কারণে মানুষ পথে নেমে দেখতে পায় ট্রাফিক পুলিশবিহীন ঢাকার রাস্তার বিশৃঙ্খল অবস্থা। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণ। তাদের সহযোগিতায় সচল হয় রাজধানীসহ সারা দেশের সড়ক। এক্ষেত্রে তাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের স্মৃতি। তাদের এই স্বেচ্ছাশ্রমের প্রশংসা করছেন সর্বস্তরের মানুষ।
বাসে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র
তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরে আরেক দফা বাসের ভাড়া বৃদ্ধি পায়। তখন বাসের সর্বনিম্ন মূল্য ভাড়া নির্ধারিত হয় ১০ টাকা। শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া নির্ধারিত হলেও প্রায়ই তার ব্যত্যয় দেখা যেত। সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এই দাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসচায় লিপ্ত হতেন বাস কন্ডাক্টররা। রাত ৮টার পরে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নিতে চাইতেন না অনেকেই। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বাসে চলাচলের সময় শিক্ষার্থীরা দিতে পারতেন না অর্ধেক ভাড়া। প্রতিটি বাস নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী যাত্রীকে অর্ধেক ভাড়ার সুবিধা দিত। এর বেশি হলে অন্যদের দিতে হতো পুরো ভাড়া। সেই চিত্রের বদল হয়েছে এখন। উপযুক্ত প্রমাণ অর্থাৎ শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র দেখালেই অর্ধেক ভাড়া নিচ্ছেন বাস কন্ডাক্টর।
ঢাকাসহ সারা দেশের বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের অনেক চালকেরই নেই লাইসেন্স। সড়ক দুর্ঘটনার পর তদন্তে জানা যেত চালরেক ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। চালকদের এমন বেপরোয়া আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা করছেন লাইসেন্সও। লাইসেন্স ঠিক থাকলেই মিলছে বাস চলার অনুমতি। ঢাকা শহরের যাত্রীবাহী বাসগুলো আগে ছিল স্বেচ্ছাচারী। মানত না কোনো নিয়মকানুন। বাসস্টপ ছাড়াও মাঝ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নিত যাত্রী। বাসস্টপে কতক্ষণ বিরতি নেবে তারও ছিল না কোনো নির্দিষ্ট নিয়মকানুন। প্রতিটি মোড়ে স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষার্থীরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন এই অনিয়ম। তারা নিশ্চিত করছেন বাস যেন শুধু বাসস্টপেই থামে এবং সেখান থেকে যাত্রী নেয়। যাত্রী ওঠানো হয়ে গেলে এবং চেকার চেক করার পর তারা বাঁশি বাজিয়ে নির্দেশ দেন বাসস্টপ ত্যাগের। ফলে যাত্রীদের সময়ক্ষেপণ হচ্ছে না। এতে যাত্রীরা ভীষণ খুশি।
প্রতিটি সিগন্যালে বাস দাঁড়ানোর পরে আগে বাসে উঠত হকাররা তাদের পসরা নিয়ে। ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে তার কোনো বাধা নেই। কিন্তু এখন সিগন্যালে শুধু হকাররাই নয়, কিছু সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে উঠছেন এই স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিও। তারা অনুরোধ জানাচ্ছেন যাত্রীদের, যেন তারা বাড়তি ভাড়া না দেন, শিক্ষার্থীরা যেন দিনেরাতে যেকোনো সময়ে, শুক্র-শনিসহ সপ্তাহের যেকোনো সময় অর্ধেক ভাড়া দেন, ট্রাফিক আইন মেনে চলেন এবং নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাসে ওঠেন এবং নামেন। উচ্ছ্বসিত বাসযাত্রীদের মধ্যে অনেককেই তাদের এই স্বেচ্ছাশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানাতে দেখা গেছে। কেউ কেউ দিচ্ছেন নানা পরামর্শ।
রিকশা চলছে লেন মেনে
ঢাকা শহরের দুর্বিষহ যানজটের অন্যতম কারণ মনে করা হয় সড়কে বিভিন্ন গতির যানবাহনের লেন না মেনে অনিয়ন্ত্রিত চলাচলকে। একই রাস্তায় বেপরোয়াভাবে চলে রিকশা, সিএনজি, বাস, ব্যক্তিগত যান, মোটরসাইকেল ও অ্যাম্বুলেন্স। একটু ফাঁক পেলেই রিকশাসহ যেকোনো যান লেন ভেঙে অন্য লেনে ঢুকে যায়। বাঁধায় জ্যাম। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রিকশাও চলছে লেন মেনে সুশৃঙ্খলভাবে। এটা ঢাকা শহরের সম্পূর্ণ নতুন দৃশ্য। এতে রিকশাচালকরা খুশি। রিকশাচালক জুবায়ের জানান, আগে ইচ্ছা না থাকলেও লেন ভেঙে এগিয়ে যেতে হতো তাদের। কারণ পেছন থেকে সিএনজি ধাক্কা দিত। আবার কখনো কখনো এগিয়ে যেতে গিয়ে সিএনজি বা বাসের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নানা ক্ষয়ক্ষতি হতো। এখন কেউ ধাক্কাধাক্কি করে না। ফলে আমরাও নিরাপদে রাস্তায় রিকশা চালাচ্ছি।
অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আলাদা লেন
ঢাকাসহ সারা দেশের সড়কে কখনো সম্ভব হয়নি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আলাদা লেন রাখার। ফলে অসংখ্য রোগী অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রিত সড়কে কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে অ্যাম্বলেন্সের জন্য আলাদা লেনের বিষয়টি। এই উদ্যোগটি সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসা লাভ করেছে।
কিছু মিষ্টি কিছু টক
যান নিয়ন্ত্রণের মতো আটপৌরে ঘটনাকেও শিক্ষার্থীরা চেষ্টা করছেন ব্যতিক্রমী উপায়ে উপস্থাপনের। সেই চেষ্টা থেকেই কেউ কেউ টেডিবিয়ারের সাজ পরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন, আবার কাউকে দেখা যাচ্ছে স্পাইডারম্যানের সাজে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে। তবে এর মধ্যে বিড়ম্বনার ঘটনাও ঘটেনি তা নয়। চট্টগ্রামে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনকালে এক শিক্ষার্থীকে অপহরণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু ছাত্রজনতার চেষ্টায় তাদের সহজেই আটক করা সম্ভব হয়। রাজধানী ঢাকায় ৯ আগস্ট রাতে এমনই একটি ঘটনার কথা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেই গাড়ি আটকের পরে জানা যায় ঘটনা ভিন্ন। ওই শিক্ষার্থী বেশ কিছুক্ষণ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনের পর তার অভিভাবক আসেন তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু তার ইচ্ছে ছিল আরও কিছুক্ষণ দায়িত্ব পালন করার। অভিভাবকরা জোর করে তাকে গাড়িতে তুলে বাসায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এই ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটে।
কিন্তু কতদিন
শিক্ষার্থীদের এই স্বেচ্ছাশ্রম দানের ঘটনায় সর্বস্তরের মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছেন। সাধ্যমতো ঠান্ডা পানি, শুকনো খাবার, ছাতা, শরবত ইত্যাদি দিয়ে তাদের সহযোগিতা করেছেন। তাদের নির্দেশ অনুরোধ মেনে সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলাচল করেছে। কিন্তু অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এই ভেবে যে, গতকাল পর্যন্ত চারদিন ধরে শিক্ষার্থীরা এই দায়িত্ব পালন করছে। তাদের সংখ্যা অনেক, উৎসাহও কম নয়। তাই বলে কি তাদের পক্ষে অনির্দিষ্ট সময় ধরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মতো একটি কঠিন, পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে যাওয়া সম্ভব? শিক্ষার্থীরা অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কিন্তু বন্ধুরা রাস্তায় দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা বাড়িতে বিশ্রাম নিতে রাজি নন। তাই অভিভাবকরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এই অবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান চান।
