শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রক্টরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালও পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাতটি আবাসিক হলের প্রভোস্ট এবং একটি হোস্টেলের প্রধানও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। গতকাল শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের মাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অধ্যাপক মাকসুদ কামাল।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা একের পর এক পদত্যাগ করছেন। সেই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামও। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর তিনি ই-মেইলে পদত্যাগপত্র পাঠান। শিবলী রুবাইয়াত নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার পদত্যাগ করেন। গতকাল প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদ থেকে অধ্যাপক ড. মো. হারুন-উর-রশিদ আসকারীসহ আরও কয়েকটি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন।
ঢাবি উপাচার্যের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে মাকসুদ কামাল গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে গতকাল শুক্রবার রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। স্বাভাবিক সৌজন্যের জায়গা থেকেই আমি এ আলোচনা করেছি। আমার পদত্যাগপত্র আগেই তৈরি ছিল। আমার মনে হয়েছে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থেই আমার পদত্যাগ করা দরকার।’
অন্যদিকে ঢাবির যে সাতটি হলের প্রভোস্ট পদত্যাগ করেছেন তারা হলেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিললাল হোসেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আকরাম হোসেন, বিজয় একাত্তর হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহিম, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ফারহানা বেগম, বেগম রোকেয়া হল প্রাধ্যক্ষ ড. নিলুফার পারভীন ও শামসুন নাহার হল প্রাধ্যক্ষ ড. লাফিফা জামাল।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিললাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাতটি হলের প্রভোস্ট পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছাত্রীনিবাসের ওয়ার্ডেন ড. শারমিন মূসা এবং কয়েকজন হাউজ টিউটর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আগামীকাল (আজ রবিবার) আরও কয়েকজন পদত্যাগ করতে পারেন।’
গত বছরের ৪ নভেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের স্থানে ঢাবির ২৯তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমানসহ প্রক্টরিয়াল বডির ১৩ জন সহকারী প্রক্টর একযোগে পদত্যাগ করেন।
এসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ : এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম পদত্যাগ না করলে তাকে অপসারণ করা হতো বলে সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে গতকাল এসইসি চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলেও অন্য কমিশনাররা এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এসইসিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে। এর ফলে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাওয়ার আড়াই মাসের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে কমিশন।
গত ২৮ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও চলতি বছরের ২৮ মে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে চার বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে ২০২০ সালের ১৭ মে তাকে প্রথমবার এসইসির চেয়ারম্যান করা হয়।
প্রথম মেয়াদের নিয়োগে নানাভাবে বিতর্কিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এই অধ্যাপক। অভিযোগ রয়েছে, এসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে শেয়ারবাজারে কারসাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে দেশে ও দেশের বাইরে গড়েন সম্পদের পাহাড়। বিশাল অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটে কমিশনের ভেতরের কর্মকর্তা, স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গ্যাম্বলার, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী আমলা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমের লোকজনও ছিলেন। এসইসিতে যোগদানের পর শিবলী রুবাইয়াতের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল অভিনব পদ্ধতিতে দুর্বল কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে কোম্পানি দখল। তার সময়ে তিন বছরে এভাবে ২৬টি কোম্পানির মালিকানা বদল হয়েছে। শিবলী রুবাইয়াতের দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিবেদন আকারে সরকারের কাছে পাঠালেও রহস্যজনক কারণে তা আমলে নেওয়া হয়নি।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদত্যাগ : বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের (ডিজি) পদ থেকে গতকাল বিকেলে পদত্যাগ করেন অধ্যাপক ড. মো. হারুন-উর-রশিদ আসকারী। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের উপপরিচালক নার্গিস সানজিদা সুলতানা গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
গত ১৮ জুলাই হারুন-উর-রশিদ আসকারীকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরে ২৪ জুলাই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হারুন-উর-রশিদ আসকারী ১৯৯০ সালের জুলাইয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে যোগদান করেন এবং ২০০৫ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। এ ছাড়া তিনি ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবের বাদশাহ খালিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। পরে তিনি ২০১৬ সালের আগস্টে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন।
