দিশাহীন প্রশাসনেও আশার আলো দেখছেন সচিবরা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪, ০৬:২৯ এএম

টানা ১৫ বছরের সাজানো প্রশাসন। যাকে সন্দেহ হয়েছে তার ওপরে ওঠার সিঁিড়ই আটকে দেওয়া হয়েছে। দলীয় লোকদের দিয়ে গড়া সেই প্রশাসন এখনো বহাল। এই বিশাল প্রশাসনিক বহরকে কাজে ফেরানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে দিশা পাচ্ছেন না মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোর চিফ অ্যাকাউন্টিং অফিসার বা সচিবরা।

গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের পরও তারা উদ্দীপ্ত হতে পারছেন না। প্রধান উপদেষ্টাকে সচিবরা তাদের সমস্যা বিস্তারিত জানাতে পারেননি। স্বভাবতই হতাশ তারা। ২৫ জন সচিবের সামনে সেটা সম্ভবও নয়। প্রধান উপদেষ্টা উল্টো সচিবদেরই নিজ থেকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। বলেছেন, যেকোনো বিষয় নিয়ে উপদেষ্টার দপ্তরে দৌড়ানোর প্রয়োজন নেই। নিজেদের কৌশল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। মন্ত্রণালয় ফাংশনাল (কার্যকর) রাখতে এবং তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

সচিবরা তাদের মনের জমানো কথা বলতে না পারলেও পরিস্থিতি কিছুটা হলেও তুলে ধরেছেন। অনেক জায়গায় কর্মকর্তারা তাদের দপ্তরে যেতে পারছেন না। কোথাও কোথাও গেলেও বসে কাজ করার মতো পরিবেশ নেই। দু-একজন সচিব এসব কথা বললেও প্রায় সবার মনেই একই ধরনের কথা জমা ছিল।

একজন সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বিশাল বিপ্লবের পর আশা ছিল প্রধান উপদেষ্টা উদ্দীপনামূলক কিছু বলবেন। সামনের দিনগুলোর অগ্রাধিকার জানাবেন। এগুলো না পেয়ে একটু হতাশ তো লাগছেই।’

প্রধান উপদেষ্টার কাছে থাকা ২৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা গতকাল বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে। ওই বৈঠকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইসমাইল হোসেন জানিয়েছেন, ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় কর্মকর্তারা তাদের দপ্তরে যেতে পারছেন না। হয়তো এসব কর্মকর্তার সঙ্গে বিগত সরকারদলীয় লোকদের সংশ্লিষ্টতা বেশি ছিল এজন্য এ ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে বলে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু ডিসি ফুড তাদের দপ্তরে যেতে পারছেন না।

বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি পরিস্থিতির কারণে অফিস করতে পারছেন না।

বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব তার মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। গত ১৫ বছরে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা পদোন্নতি দাবি করছেন। এ ছাড়া পাবলিক সার্ভিস কমিশন সুপারিশ করার পরও যাদের রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়নি, তারাও তাদের নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করার জন্য সচিবালয়ে ভিড় জমাচ্ছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হলো নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া। এই কাজ গতিশীল করার জন্য নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগে (এপিডি) নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন ১৭ ব্যাচের কর্মকর্তা ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রউফ। নতুন এ কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা।

সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এপিডি ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় খুলনায় যোগদান করেন। এই কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। গত সরকারের আস্থাভাজন হিসেবেই যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান।

জানতে চাইলে পদোন্নতিবঞ্চিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি ও বিসিএস ১৩ ব্যাচের সিনিয়র সহকারী সচিব মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগ (এপিডি) বিভাগে কাজ করার মতো যোগ্য কর্মকর্তার সংকট রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হওয়ার পরও বিষয়টি মেনে নিতে হচ্ছে।’

শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েই নয়, দাবির মিছিল দেখা যাচ্ছে দপ্তরে দপ্তরে। জনপ্রশাসনের মতো প্রকাশ্যে না হলেও দপ্তরে দপ্তরে এসব মিছিল দেখা যাচ্ছে। বিমানের কর্মচারীরা এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাদের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। পুলিশ নিজেদের সেক্টরে সংস্কার দাবি করছে। তাদের মতো আনসার সদস্যরা তাদের দাবি নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছেন। প্রকল্পের কর্মকর্তারাও তাদের দাবি জানান দিচ্ছেন। বিভিন্ন সেক্টরের মাস্টার রোলের কর্মচারীরা স্থায়ী নিয়োগের দাবি জানাচ্ছেন।

বিসিএস ২৮ থেকে ৪২ ব্যাচ পর্যন্ত পাবলিক সার্ভিস কমিশন সুপারিশ করার পরও প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়নি সরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের নিয়োগবঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে আদালতের রায় নিয়ে যাওয়ার পরও সরকার তা আমলে না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়োগবঞ্চিতদের নিয়োগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী সপ্তাহেই তাদের নিয়োগ হতে পারে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারা পিএসসির ২৮ থেকে ৪২ ব্যাচের বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তাদের বিষয়ও আমরা উপস্থাপন করেছি প্রধান উপদেষ্টার কাছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত সমস্যাটির সমাধান করতে পারব।’

প্রশাসনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে গতকাল নিজেদের সেক্টরের একজন বিশেষ সহকারী পেয়ে খানিকটা খুশি হয়েছেন সচিবরা। গতকাল রাতে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাতে বিষয়টি জানিয়ে একজন সচিব বলেছেন, বিষয়টি শুরু থেকে থাকলে অনেক সুবিধা হতো। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আমাদের সেতু হিসেবে কাজ করতে পারবেন।

এদিকে যে তারুণ্যের শক্তির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, সেই তারুণ্যকে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান এ আহ্বান দিলেও এ নিয়ে দোটানায় রয়েছেন সচিবরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব বলেছেন, এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে আরও ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে তিনি জানান।

ওই সচিব আরও বলেছেন, ‘আমি গাইডলাইন পাওয়ার আশায় গিয়েছি। গাইডলাইন না পেলেও স্বাধীনভাবে কাজ করার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। কারণ দীর্ঘ চাকরিজীবনে কোনো সরকারপ্রধান বলেননি নিজের মতো করে কাজ করতে, যা বলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।’ প্রধান উপদেষ্টার এ নির্দেশনার মধ্যে আশার আলো খুঁজে পাচ্ছেন এ সচিব।

সচিবদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক : সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তরুণদের কাজে লাগিয়ে স্বচ্ছতা ও সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের দিকনির্দেশনা দেন তিনি।

নিজের হাতে থাকা ২৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা।

গতকাল বেলা সোয়া ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বৈঠক হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যমুনায় প্রবেশ করেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে তিনি সোয়া ১১টায় বের হয়ে যান।

সচিবদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, সব মন্ত্রণালয়ের কাজ দ্রুত চালু করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এজন্য সাত দিন সময় দিয়ে এখন থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, ‘ড. ইউনূস তারুণ্যের শক্তির ওপর আলোকপাত করেছেন। সেখানে বলেছেন যে, তারুণ্যের শক্তির মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, এর মাধ্যমে একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা যেন এ সুযোগটা কাজে লাগাই। যেন আমরা প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগের কাজগুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারি, এ বিষয় তিনি সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন।’

বৈঠকে সচিবদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও এ সময় জানান তিনি।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন সচিবরা। এ সময় জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও বলেন প্রধান উপদেষ্টা। একই সঙ্গে বন্দর ও রেলপথ দ্রুত চালুর নির্দেশ দেন। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং সার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, খাদ্যসহ জরুরি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে সাত দিনের মধ্যে তালিকা করে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়ে তালিকাগুলো তার কাছে দেওয়ার নির্দেশ দেন ওই বৈঠকে।

সংবাদ সম্মেলন ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন বা এদিন সরকারি ছুটি থাকবে কি না, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি।’

চলমান প্রকল্প নিয়ে কোনো কথা হয়নি জানিয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, ‘মূলত মন্ত্রণালয়, বিভাগগুলোকে ফাংশন করা, দপ্তরগুলোকে ফাংশন করাটাই হচ্ছে এখনকার মূল কাজ। যে কাজগুলো সচিবালয় বা দপ্তর পর্যায়ে নিষ্পত্তি করা যাবে, সেগুলো যেন নিষ্পত্তি করা হয়। যেগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না, তার (প্রধান উপদেষ্টা) কাছে আমরা সিদ্ধান্তগুলো চাইব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত