প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, বিগত বছরগুলোতে বিচার প্রক্রিয়ায় বিচারবোধ ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধকে বিনষ্ট করা হয়েছে। বিচারক ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেছেন, কেউ অন্যায় বা শিষ্টাচার লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের বিচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
গতকাল সোমবার আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচারকক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) অনুষ্ঠিত সংবর্ধনায় এসব কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। গত রবিবার প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর গতকাল এজলাসে বসেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
বেলা পৌনে ১১টার দিকে প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে সাম্প্রতিক ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ও আইনজীবীসহ উপস্থিত সবাই। প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া সংবর্ধনায় আইনজীবী ও আগতদের উপস্থিতিতে এজলাসকক্ষ ছিল পূর্ণ। সংবর্ধনায় প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষে সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য দেন।
সংবর্ধনার জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা ও গভীর শ্রদ্ধা জানাই গণজাগরণে আত্মদানকারী প্রত্যেক শহীদের স্মৃতি প্রতি। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানের সময় অসংখ্য শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমি তাদের সবার দ্রুত নিরাময় ও সুস্থতা কামনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এর ফলে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের কারণ আপনারা সবাই অবগত। এই মুহূর্তে আমরা এক ধ্বংস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। বিগত বছরগুলোয় বিচারপ্রক্রিয়ায় আমাদের বিচারবোধ, ন্যায়বিচারের মূল্যবোধকে বিনষ্ট ও বিকৃত করা হয়েছে। সততার বদলে শঠতা, অধিকারের বদলে বঞ্চনা, বিচারের বদলে নিপীড়ন, আশ্রয়ের বদলে নির্যাতনকে স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত করা হয়েছে। অথচ এ রকম সমাজ ও রাষ্ট্র আমরা চাইনি। এই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন যাত্রা শুরু করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আজ থেকে প্রতিটি শ্রেয়, শুভ ও কল্যাণকর কর্মে সবাই বিচার বিভাগকে আপনাদের পাশে পাবেন। আমি সচেতন আছি, আমাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট ছাড়াও জেলা জুডিশিয়ারি হলো বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় ও বিস্মৃত ক্ষেত্র। অধস্তন জুডিশিয়ারিতে কর্মরত বিচারক সহকর্মীরা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের সাধারণ মানুষ বিচার বিভাগ বলতে মূলত ডিস্ট্রিক্ট জুডিশিয়ারিকে বোঝেন।’
জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরতদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি আপনাদের পাশে আছি। আপনারা কোনো ধরনের অন্যায়, চাপ ও ভয়ভীতির আশঙ্কা করবেন না। নির্ভয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে বিচারিক কাজ পরিচালনা করুন। আমরা সবাই জানি, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ভগ্নদশা থেকে বিচার বিভাগও মুক্ত নয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার বিজয়ের এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সুবর্ণ সুযোগ আমাদের সামনে এনে দিয়েছে। আমরা যেন এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারি, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।’
শিষ্টের লালন ও অন্যায়ের দমন হলো বিচার বিভাগের শাশ্বত দায়িত্ব এ কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ‘যে কেউ ভালো কাজ করলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।’
এর আগে সকাল ৭টার দিকে প্রধান বিচারপতি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ঢাকায় ফিরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে জাতীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
