অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিরও চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪, ০৮:০৩ পিএম

সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ইমিডিয়েটলি শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বজায় রাখা। এটা না করতে পারলে অর্থনৈতিক দিকটায় ফোকাসই করতে পারবে না সরকার। এটাই করতে হবে আজকে থেকে। সঙ্গে সঙ্গে তিন ধরনের রিফর্ম করতে হবে সরকারকে।

একটা হচ্ছে পলিটিক্যাল রিফর্ম। সেটা নিয়ে বেশি কিছু বলব না। কিন্তু আমরা যাতে আবার কোনো ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরত না যাই; পরিবারতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরত না যাই; পার্টিগুলোর মধ্যে যেন গণতন্ত্র থাকে এবং লোকাল লেভেল থেকে যেন লিডারশিপ তৈরি হয়ে আসতে পারে এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। ওপর থেকে নমিনেশন চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবসা যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। পার্টির ডেমোক্রেসিতে লিডারশিপের একটা টার্ম লিমিট থাকতে হবে এবং সরকারের মধ্যেও থাকতে হবে। তারপর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও এই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। এই সংস্কার যদি করতে পারি, তাহলে আমরা টেকসইভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সংস্কার এবং সার্ভিস ডেলিভারিকে ইমপ্রুভ করতে পারব। এসব করতে গেলে কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম লাগে সেটা করতে হবে এই সরকারকে।

সার্ভিস ডেলিভারি কীভাবে ইম্প্রুভ করা যায়? অর্থাৎ সরকারি সেবা কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে, তড়িৎ-গতিতে এবং ঘুষবিহীনভাবে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে আমাদের পুলিশের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, অপারেশন সবকিছুতেই ইমপ্রুভ দরকার। দ্বিতীয় হলো পাসপোর্ট অফিস, তৃতীয় হলো লাইসেন্স অফিস, চতুর্থ হলো ভূমি মন্ত্রণালয়। এ রকম ৮-১০ জায়গায় সরকার যদি ফোকাস করতে পারে এবং বছরখানেকের মধ্যে যদি টেনজিবল চেঞ্জ নিয়ে আনতে পারে, তাহলে সরকারের ক্রেডিবিলিটি বাড়বে, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে যে সরকার ঠিক কাজই করছে এবং তাদের আরও সময় দেওয়া হোক।

এগুলো করতে হবে, কারণ এসব কিন্তু অর্থনীতির বাইরে নয়। মনে রাখতে হবে যে আমি যদি পলিটিক্যাল রিফর্ম না করতে পারি, যদি আমি সার্ভিস ডেলিভারি ইমপ্রুভ না করতে পারি, তাহলে অর্থনীতি কখনোই ভালো হতে পারবে না। কারণ কস্ট অব ডুইং বিজনেস আমার হাতে দাঁড়াতে পারবে না। এজন্য এসব আলাদা মনে হলেও তাদের গুরুত্ব আমাদের অর্থনীতিতে অনেক।

এবার আমরা যাকে সরাসরি অর্থনীতির বিষয় বলে জানি, সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। এখানে দুই ধরনের সমস্যা আছে। একটা হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমস্যা, আরেকটা হচ্ছে আমাদের কাঠামোগত সমস্যা। সামগ্রিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। মূল্যস্ফীতি কমাতেই হবে, এটাকে অন্তত ৫-৬ শতাংশে নামাতে হবে এবং সেটা খুব দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। আমাদের পলিসিতে অলরেডি এটা আছে এবং সেটা রাইট ডাইরেকশনে টাইট অবস্থাতেই রাখতে হবে, এখানে ঢিল দিলে চলবে না।

বাজেটে যা আছে তার থেকে সরকারের ব্যয় ৮০-৯০ হাজার কোটি টাকায় কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। এটা সাপোর্ট দেবে ম্যাক্রো ইকোনমিতে। তাহলে আমার ধারণা যে এক্সচেঞ্জ রেটও স্টেবল হয়ে যাবে। ইনফ্লেশন রেট, এক্সচেঞ্জ রেটকে বাজেটভিত্তিক রাখতে হবে কিন্তু স্টেবল থাকবে এবং ইনফ্লেশন কমে আসবে। এই পলিসিতে স্ট্রিক্ট থাকতে হবে সরকারকে। এটা হলে পরে রিজার্ভ লেভেল বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল, মাল্টিন্যাশনাল ডোনার আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এদের সমর্থন আমরা পাচ্ছি এবং তারা ইতিমধ্যেই জানিয়েছে সেটা। ফলে, এ রকম হলে কিন্তু আরও বেশি রিসোর্স আমরা চাইতে পারি। আইএমএফের কাছে চাইতে পারি যে আরও দু-তিন বিলিয়ন বাড়িয়ে দাও, আবার ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কাছেও চাইতে পারি। নতুন সরকার সে আবদার করতেই পারে এবং সেটা হয়তো তারা বুঝবে এবং মানবে।

কাঠামোগত বিষয়ে আমি তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে বলব। আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জগুলো তো আমরা জানি। আমরা দেখেছি, ভালো ব্যাংকগুলোর এক্সিট হয় না, খারাপ ব্যাংকগুলোতেই গ-গোলটা শুরু হয়। এটাকে খুব তাড়াতাড়ি যদি কন্ট্রোল করতে না পারি, তাহলে সমস্যা। এখানে ইমিডিয়েটলি একটা টাস্কফোর্স বা কমিশন করতে হবে। যেটা প্রত্যেক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ইন্ডিভিজুয়ালি রিভিউ করে করে তাদের প্রত্যেকটাকে পুনর্গঠন করা যায় কি না দেখবে, না হলে তাদের একীভূত করে ফেলতে হবে। যেমন সরকারি চারটি ব্যাংক না রেখে একটি ব্যাংক রাখা। যেমন ইসলামী ব্যাংক, যেগুলো এস আলমের আছে সবগুলোকে মিলিয়ে একটা ব্যাংক রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো করার পরও এখানে হয়তো দু-এক লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি বা জরিমানা দিতে হবে সরকারকে। সেই টাকা কীভাবে হবে, ফাইন্যান্সিং প্ল্যান কী হবে সেগুলো ওই কমিশন নির্ধারণ করবে পরামর্শ করে। ছয় মাসের মধ্যে একটা রোডম্যাপ করে তারপর এটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা করতে হবে আইএমএফ, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে। এবার আসা যাক অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল ক্ষেত্রে। স্টক মার্কেট, ইনস্যুরেন্স সেক্টর এবং নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। সেটা নিয়ে আরেকটা টিম কাজ করুক। সেখানে তাদের স্পেশালাইজড হতে হবে। তারা প্ল্যানিং করবে যে কীভাবে কী করতে এবং প্রয়োজনে দুটি টিমের ক্ষেত্রেই ইন্টারন্যাশনাল এক্সপার্টদের নিয়ে আসতে হবে। তারা বাংলাদেশি এক্সপার্টদের সঙ্গে বসে তাদের এক্সপেরিয়েন্সটা শেয়ার করে সুন্দর একটা স্টেপ নিতে পারে। এটা আমরা ছয় মাসের পথেই বাস্তবায়ন শুরু করতে পারি।

দুই নম্বর স্ট্রাকচার হচ্ছে আমাদের ট্যাক্স লেভেল। ট্যাক্সে ৭.৫০%-৮% এক্সেপ্টেবল না এবং এটাকে ভারতের কাছাকাছি নিতে হবে। ভারতের লেভেলটা হচ্ছে ১৮ শতাংশ, ভারতের লেভেলটাও খুব বেশি এক্সেপ্টেবল না। নেপালে এর চেয়েও বেশি। কাজেই ভারতের কাছাকাছি যদি আমরা নিতে পারি, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। অনেক ব্যয় বাড়াতে পারব, আমাদের ঋণের বোঝাটা আর বোঝা থাকবে না, অনেক কিছুই সহজ হয়ে যাবে এবং অনেক সুবিধা আসবে। এনবিআরের তিনটা উইং আছে কাস্টমস, ভ্যাট এবং ট্যাক্স। তিন উইংয়ের জন্য তিনটা আলাদা কমিটি করতে হবে। কেননা একটা কমিটি এটা করতে পারবে না এবং সম্ভবও নয়। এই তিনটা কমিটির সঙ্গে আলাদা আলাদা ইন্টারন্যাশনাল এক্সপার্ট দিতে হবে। তাদের সঙ্গে বসে বাংলাদেশের অটোমেশন কীভাবে হবে, বাংলাদেশের ট্যাক্স সেকশনকে কীভাবে ঢালাওভাবে সাজাতে হবে এই জিনিসগুলো পয়েন্ট আউট করে আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন শুরু করে দিতে হবে। লক্ষ্য হবে যে করাপশনটাকে দূর করতে হবে।

তৃতীয়ত হচ্ছে, সেটাকে আমি বলব ক্রিটিক্যাল রেভল্যুশন স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। কীভাবে? বাই প্রোভাইডিং রিসোর্সেস অ্যান্ড সিফটিং সাম অব সেক্টর। যেমন এডুকেশন। এডুকেশনের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি লেভেলটা ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে দিয়ে দেওয়া যায়। এরপর লোকাল যে হাসপাতাল আছে, যেমন ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতাল এবং ছোট ছোট ক্লিনিক, পাবলিক হেলথ এগুলো সবই লোকাল গভমেন্টে ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে দিয়ে দেওয়া দরকার এবং তাদের বাজেটের এলোকেশন দিয়ে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় শুধু মনিটর করবে এবং কার্যকলাপ দেখবে, তাদের মিসিংগুলো দেখবে কিন্তু হস্তক্ষেপ করবে না। লোকাল গভমেন্টকে ক্ষমতা দিয়ে, তার থেকে এটা করিয়ে নিতে হবে। তখন প্রোপার রেভল্যুশন এবং লোকাল লিডারশিপটা তখন গ্রো করবে। এটা খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে, পলিটিক্যাল রিফর্ম যেটা বলছি, সেটাকে সাকসেসফুল করার জন্য। তা না হলে পলিটিক্যাল রিফর্ম সাকসেসফুল হবে না। এটা হচ্ছে থার্ড রিফর্ম এবং এটা করা উচিত।

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে পারলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরি হবে। পলিটিক্যাল সাইডে যদি প্রাইমারি সিস্টেম চালু করা হয় (নমিনেশন সিস্টেম না) লোকাল ইলেকশনের মাধ্যমেই, লোকাল পার্টি তাদের নেতা ঠিক করবে, কেন্দ্র ঠিক করবে না। তাহলে কিন্তু পাওয়ারটা চলে যাবে সেন্ট্রাল থেকে লোকালে এবং লোকাল গভমেন্টটা যদি শক্তিশালী হয়, তাদের এক্সপেরিয়েন্সও ভালো হবে, তাদের গ্রুমিংটা হবে এবং তারা বড় দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আরও বেশি যোগ্য হয়ে উঠবে, যখন পরিস্থিতি আসবে।

তবে সবার আগে আশু পদক্ষেপ হচ্ছে, প্রথমে যেটা বললাম অব ল অ্যান্ড অর্ডার পুনরুদ্ধার করতে হবে। অর্থাৎ এটা আওয়ামী লীগের অমুকের প্রতিষ্ঠান এটাকে পোড়াও এগুলো করা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ক্ষোভটা জেনুইন। কিন্তু তাদের আমাদের সংযত পর্যায়ে রাখতে হবে, যদি তারা দোষী থাকে, যদি তারা অপকর্ম করে থাকে, অবশ্যই তাদের আইনগতভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু জ্বালাও-পোড়াও করে এটাকে আমরা ধ্বংস না করি, রেভল্যুশনটাকে যেন আমরা কলুষিত না করি।

আসলে এসবই তিন-চার বছরের বিষয়। সরকারকে চিন্তা করতে হবে যে তাদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে কিছু রেজাল্ট দিতে হবে। সেটা হবে এই সার্ভিস এবং মূল্যস্ফীতির ওপর। বিনিময় হার স্থিতিশীল করা সম্ভব। সার্ভিস ডেলিভারিতে পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে হলেও আমাকে ইম্প্রুভমেন্ট রেজাল্ট দিতে হবে। তারপর এক বছরের মধ্যে আরও ভালো ইমপ্রুভমেন্ট দিতে হবে সরকারকে। কিন্তু কিছু টেনজিবল রেজাল্ট যেন সরকার দিতে পারে জনগণকে, সেটা দেখাতে হবে। ক্যাপাবিলিটি এবং লেজিটিমেটি এই দুটো কারণে এগুলো করতে হবে। পরে এক বছরের মধ্যে আরও কিছু টেনজিবল রেজাল্ট দিতে হবে। এগুলো স্টেপ বাই স্টেপ। সরকারকে একটা রোডম্যাপের মাধ্যমে করতে হবে এসব। একটা সঠিক পদ্ধতিতে ছয় মাসের মধ্যে কিছু রেজাল্ট সরকারকে দেখাতে হবে। ফলে তারা কেন এবং কী কী রিফর্ম আনতে তিন বছর বা চার বছর থাকা দরকার সেটা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

(অনুলিখিত)

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই)

(পূর্বে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত