কারও পায়ে, কারও পেটে আবার কারও চোখের পাশ দিয়ে গুলি লেগে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে বেরিয়েছে। অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে আহত বহু মানুষ এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকা মেডিলেক কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড আর নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ)। বুলেটের দগদগে ক্ষত নিয়ে জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তারা।
তাদেরই একজন দিনমজুর লিটন (২৫)। গত ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তলপেটের সামনে গুলি লেগে বেরিয়ে যায় পিঠ দিয়ে। ক্ষতস্থান দিয়ে যেন নেমেছিল রক্তের নহর। ফলে শরীরে দেখা দিয়েছে রক্তস্বল্পতা। তাকে বাঁচাতে গত ১০ দিনে সাতবার রক্ত দেওয়া হয়েছে। গুলিবিদ্ধ শরীরে করা হয়েছে দুইবার বড় ধরনের অস্ত্রোপচার। তবুও সাগর শঙ্কামুক্ত নন বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
গত বৃহস্পতিবার ঢামেক হাসপাতালের উচ্চনির্ভরতা ইউনিট (এইচডিইউ) বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, একটি শয্যায় চিকিৎসাধীন অচেতন লিটন। মাথার কাছে টুলে বসে আছেন তার স্ত্রী আছিয়া, ছলছল চোখ। রোগীর কী অবস্থা? এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুক্ষণ চোখের জলে ভিজল তার গাল। এরপর নিজেকে সংবরণ করে কান্না জড়ানো কণ্ঠে অছিয়া বলেন, ‘জ্ঞান আসে আর যায়। চোখ খুললে ফ্যাল ফ্যাল কইরা চাইয়া থাকে। পেট ফাইরা অপারেশন করছে। অবস্থা ভালো না। ডাক্তার তো আশা দেয় না।’
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে যাত্রাবাড়ী মোড় এলাকা থেকে রায়েরবাগের ভাড়া বাসার দিকে যাচ্ছিলেন লিটন। এ সময় যাত্রাবাড়ী থানার দিক থেকে আচমকা গুলি ছুড়লে পথচারীরা যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি করতে থাকেন। তবে লিটন সেটা পারেননি। কারণ, তার একটা পা ভাঙা ছিল। সেই সময় একটি বুলেট বিদ্ধ হয় তলপেটে। স্বামীর অনিশ্চিত জীবন, চিকিৎসার জন্য দরকার অনেক টাকা আর রক্ত। এমন পরিস্থিতিতে সবকিছুর হাল ধরতে হয়েছে সাধারণ গৃহিণী আছিয়াকে। কীভাবে কী করবেন এসব ভেবে দুশ্চিন্তার অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন। নিজেকে কিছুটা শক্ত করে বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হ্যার (লিটন) শরীর থাইকা অনেক রক্ত পইড়া গেছে। এহন ডাক্তার কইতাছে আল্লারে ডাকেন। আমি দুই দিন ধইরা কামে যাইতে পারি না। ট্যাকা পয়সার জন্য ইটনা ফোন দিছি (কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামের বাড়ি), মানুষজন রক্ত দিতাছে, সাহায্য দিতাছে।’
গত বৃহস্পতিবার ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে ১৯ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। যাদের মধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের আন্দোলনের সময় সহিংসতায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন সাতজন। এই সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই গুলিবিদ্ধ এবং দুজন মারাত্মক শারীরিক আঘাত পেয়েছেন। এ ছাড়া ঢামেক হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত হাসপাতালটির বিভিন্ন ইউনিট ও ওয়ার্ডে আন্দোলনে আহত ১৮৪ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। যাদের মধ্যে প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ। এইচডিইউতে চিকিৎধীন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল মোস্তাফা। পেটে গুলিবিদ্ধ শাকিলকে প্রতিদিন অন্তত চার ব্যাগ রক্ত দিতে হচ্ছে বলে জানান তার বন্ধু আবদুল গণি। গণি বলেন, ‘তাকে (শাকিল) এক ব্যাগ হোয়াইট ব্লাড সেল দিতে হবে। সকালে দুই ব্যাগ তাজা রক্ত লেগেছে। বিভিন্ন মানুষজন ও সংগঠনের মাধ্যমে আমরা রক্ত সংগ্রহ করছি।’
আহত এই শিক্ষার্থীর বাবা পেশায় কৃষক বাবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট সকালে রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর থেকে হাউজ বিল্ডিংয়ের মাঝামাঝি এলাকায় শাকিলের তলপেটে গুলি লাগে। ওইদিনই স্থানীয় একটি হাসপাতাল থেকে রাত ৮টায় স্থানীয় কয়েকজন তাকে এখানে (ঢামেক হাসপাতাল) নিয়ে আসে। আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা রক্ত দিয়ে ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে শাকিলের চিকিৎসা খরচ মেটাচ্ছে।’
ঢামেক হাসপাতালের এই ইউনিটে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক বলেন, ‘এখানে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন সবার অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। কারও কারও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রচুর রক্ত লাগছে।’
ঢামেকের চক্ষু বিভাগের ৩০১ নম্বর ওয়ার্ডের ৫ নম্বর শয্যায় গুলিতে ক্ষতবিক্ষত চোখ নিয়ে শুয়ে ছিলেন আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম। গত ৮ আগস্ট জামালপুর জেলা কারাগারে বন্দিদের দুই গ্রুপ এবং পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তার ডান চোখে গুলি লাগে। এরপর তাকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। জেল পালাতে চাওয়া এই কয়েদির অবস্থা এতই নাজুক যে, কথা বলারও শক্তি নেই। রফিকুলের পাশেই প্রহরায় ছিলেন আনিছুর রহমান নামে এক কারারক্ষী। তিনি রফিকুলের বিষয়ে বলেন, ‘আমি আজ প্রথম ডিউটিতে আসলাম, চোখের দিকে তাকানো যায় না, ভয় লাগে। সকাল থেকে কিছু খাচ্ছে না। আমার আগে যারা ডিউটিতে ছিল তারাও খাওয়াতে পারেনি।’
দীর্ঘ সময় চেষ্টার পর কথা বলেন রফিকুল। তিনি জানান, বাবার নাম জালাল উদ্দিন। গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ভাটার ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে। রফিকুলের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ৩০১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন নার্স বীথিকা রানী বলেন, ‘ডান চোখটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, আপাতত ড্রেসিং চলছে। এ ধরনের আঘাতে ইনফেকশনের (সংক্রমণ) সম্ভাবনা থাকে। রোগীর অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’
৩ দিনের রিমান্ডে সাবেক এমপি লতিফ
বাংলাদেশে আসতে ইচ্ছুক সাংবাদিকদের দ্রুত ভিসা দিতে বলা হয়েছে
‘রাতের রাস্তা দখল’ কতটা চাপে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলো?
মাকে পাকা দালান বানিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন কেড়ে নিলো একটি গুলি
অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে
ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবের বাসায় এত টাকা এলো কীভাবে?