ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলন দমানো যায় না

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ১২:৩৪ এএম

পাকিস্তান সরকার ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য ইন্টারনেটে বিধিনিষেধ আরোপ করতে যাচ্ছে। জাতীয় ফায়ারওয়াল ও কনটেন্ট ফিল্টারিং সিস্টেম বসানোর কারণেই দেশটিতে ইন্টারনেটের গতি কমে  গেছে। রাষ্ট্র চাচ্ছে নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়াতে এবং একইসঙ্গে, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে। সরকার চায় কেউ যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর দেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর বিষয়ে কথা না বলতে পারে। আর তা নিশ্চিত করার জন্য এই উদ্যোগ। ফায়ারওয়াল পরীক্ষার কারণে বড় আকারে ইন্টারনেট সেবা ও সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে বিঘ্ন ঘটছে। দেশটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষনেতা ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই উদ্যোগ। সঙ্গে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা খাতে ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে দেশ জুড়ে সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে গত ১৭ জুলাই রাতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যায়। ইন্টারনেটহীনতার ৫দিন কেটেছে দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। কেননা বর্তমান সময়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং লেনদেন সবই ইন্টারনেট-ভিত্তিক। আন্দোলন দমনকারীদের নামে সাবেক সরকার বাংলাদেশের ইন্টারনেট কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। যেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের খবর ছড়াতে না পারে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ছাত্ররা ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ এবং দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের সফলতার পর পাকিস্তানেও বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের মুভমেন্ট চলছে। সম্প্রতি তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি না দেওয়া হলে পাকিস্তান স্টুডেন্ট ফেডারেশন (পিএসএফ) সতর্ক করেছে যে, তারা দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু করবে। অন্যদিকে বেলুচিস্তান স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স গত বৃহস্পতিবার বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছে। মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে তারা এ বিক্ষোভ শুরু করেন। কোয়েটা প্রেস ক্লাবের সামনে নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। এসব প্ল্যাকার্ডে দাবির বিষয়গুলো তুলে ধরেন তারা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভর্তি পরীক্ষার ফি বৃদ্ধি করায় দরিদ্র শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী মত নজরদারিতে আনতে পাকিস্তান ইন্টারনেটে ফায়ারওয়াল বসিয়েছে। পাকিস্তানের একটি আইটি অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শুরু থেকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৪০ ভাগ কম গতিতে ইন্টারনেট চলছে। পাকিস্তানের আইটি প্রতিষ্ঠানের সংগঠন পাকিস্তান সফটওয়্যার হাউসেস অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই ফায়ারওয়ালের কারণে পাকিস্তানের আইটি খাতকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার গচ্চা দিতে হতে পারে। যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ক্ষতি হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এই ক্ষতির হিসাব কষে। এছাড়া ৫দিন পর ইন্টারনেট ফিরলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ থাকে প্রায় ১৭ দিন। এর ফলে ই-কমার্সের ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। কারণ তাদের ব্যবসাই ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে। ফলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি ওই সময় ১৭ দিনে তাদের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।

ইন্টারনেট বন্ধে সংকটে পড়েন ফ্রিল্যান্সাররা। সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা সাড়ে ৬ লাখের বেশি এবং বাংলাদেশে প্রতি বছর বার্ষিক ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকার মতো আয় করছে ফ্রিল্যান্সার সেক্টর থেকে। টানা পাঁচদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এর বড় প্রভাব পড়েছে এই খাতে। যদিও কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা ধারণা করা যাচ্ছে না। কারণ অর্ডার হাতে নিয়ে মাঝপথে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। এখন যোগাযোগ করে বুঝতে হচ্ছে, তারা বিষয়টি কীভাবে নিয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী যে ক্ষতি হতে যাচ্ছে সেটি ধারণা করা যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয় এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বন্দরের চার্জ ৪৫ মার্কিন ডলার। রপ্তানিপণ্য জাহাজীকরণ না হওয়ায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, যার ফলে বন্দরের আয় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা কমে যায়। ইন্টারনেট না থাকায় সামগ্রিকভাবে, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি ইন্টারনেট নির্ভর। আমদানি-রপ্তানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ই-মেইলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিদেশি ব্যাংক ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইন্টারনেট না থাকায় রেমিট্যান্স আসা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।

ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি, নাশকতাকারীদের হামলায় ডাটা সেন্টার পুড়িয়ে ফেলায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছিলেন সাবেক তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী। যদিও নাশকতা দমন বা সরকারবিরোধী কণ্ঠ রোধ করার কৌশল হিসেবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে আমরা এ বিষয়ে অবহিত হয়েছি। সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। দেশের ক্ষতি হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের উচিত বাংলাদেশে ইন্টারনেট বিঘ্নের ক্ষতির হিসাব জেনে নেওয়া। এটা তাদের দেশের অর্থনীতির জন্যই মঙ্গল হবে। আর ইন্টারনেট বন্ধ করে সব আন্দোলন দমন করা যায় না। ইতিমধ্যে আমাদের ছাত্র-জনতা সেটি প্রমাণ করেছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক  ও সংবাদ বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত