গত রবিবার ঢাকা পরিণত হয়েছিল দাবির শহরে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে আগারগাঁও থেকে খামারবাড়ি, কাকরাইল মোড় অথবা শিক্ষা ভবন, মিরপুর সড়ক যেন বিভিন্ন দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন দাবিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেন ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের নারীরা। বেতন বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং চাকরি জাতীয়করণ করে পুলিশ সদস্যদের মতো রেশন ও পেনশন সুবিধার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে গ্রাম পুলিশ। চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি করেছেন সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (সেসিপ) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আন্দোলন করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। তারা বাকি পরীক্ষাগুলো বাতিল করে বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়নের দাবিসহ ৪ দফা জানিয়েছেন। চাকরি ফিরে পেতে পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যরা। ফলে শহরের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয় অসহনীয় যানজট।
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে সোমবার প্রকাশিত হয়েছে ‘ঢাকা এখন দাবির শহর’ এবং ‘অবস্থান অবরোধে রাজধানীতে তীব্র যানজট’ প্রতিবেদন। জানা যাচ্ছে- গত ৩ দিনে ঢাকায় প্রায় ২০টি বিক্ষোভ, মানববন্ধন, ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দুয়েক সপ্তাহে আরও নতুন কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে মাঠে নামতে পারেন অনেকেই, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিতে ফের আন্দোলনে নেমেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। এ দাবিতে গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। দাবি পূরণ না হলে লাগাতার কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। একই দিনে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন আউটসোর্সিং খাতের অন্তত ২০ হাজার কর্মী। শনিবার ভর্তি পুনর্বহালের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে মানববন্ধন করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুলের প্রথম শ্রেণির ১৬৯ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। গত শুক্রবার আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন এবং আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শাহবাগ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত ‘কালচারাল শোডাউন’ করেছে ‘সমতলের আদিবাসী ছাত্র-যুব ও সাধারণ জনগণ’। একই দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশ করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের নেতারা। বাংলা মোটরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের সামনেও একটি দল দাবি আদায়ে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) শিক্ষার্থীরা দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন। একই সড়কে চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য অবস্থান করেছে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা স্বেচ্ছাসেবী (মহিলা) দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ। মাদ্রাসা বোর্ডে বৈষম্যরোধের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি। তৃণমূল নাগরিক আন্দোলন নামে একটি সংগঠন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিচারের দাবিতে সমাবেশ করেছে। বিডিআর থেকে চাকরিচ্যুত সদস্যদের একটি দল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিতে চেয়েছেন। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে বেলা ৩টার দিকে একদল শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করেন। এ ছাড়া হলে থাকার সিটের নিশ্চয়তার দাবিতে নিউ মার্কেটের সামনে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সামনের ব্যস্ত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন একরামুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগ চেয়েছেন তারা। এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে সড়ক অবরোধ করেন সেখানকার পরীক্ষার্থীরা।
দাবি পূরণের বিষয়টি নির্ভর করে আন্দোলনের যৌক্তিকতা এবং গতিপ্রকৃতির ওপর। তবে যৌক্তিক দাবির সমাধান দরকার। বর্তমানে ক্ষমতায় আছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। তাদের কাছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অনেক দাবি। তবে এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু দাবি পূরণ করা হয়তো সম্ভব। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ভাবতে হবে। আবার দাবি করা পক্ষগুলোকেও কিছু বাস্তবতা বুঝতে হবে। তাদেরও খেয়াল রাখতে হবে সরকারের সীমাবদ্ধতা।
