শরীরে খই ফোটা গুলির চিহ্ন

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৪৭ এএম

উত্তাল জুলাইয়ের ১৯ তারিখ শুক্রবার। কোটা আন্দোলন দমাতে সর্বশক্তি নিয়ে রাজপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছাত্রদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে জনতার মাঝে। ওই দিন জুমার নামাজের পর থেকেই আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে। একপর্যায়ে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। ছাত্র-জনতার ইটপাটকেলের জবাবে পুলিশ ছুড়ছে ছররা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল।

এমন যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও স্ত্রী ও শিশুসন্তানের জন্য খাদ্য সংস্থানে ওই দিন বাইরে বের হয়েছিলেন দিনমজুর হাবিব খান। এরপর তার বুকে, মুখে ও পিঠে লাগে ২২০টি ছররা গুলি। হারান এক চোখের দৃষ্টি। কয়েক হাসপাতাল ঘুরে ১৩ দিন পর ঘরে ফিরেছেন হাবিব।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মোহাম্মাদিয়া হাউজিং লিমিটেড এলাকার বাসিন্দা স্যানিটারি মিস্ত্রি হাবিব। হাউজিংয়ের ২ নম্বর সড়কের পাশে ফাঁকা জায়গায় একটি টিনের ঘর। সেখানেই স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তার বসবাস। মাস শেষে ভাড়া বাবদ গুনতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। গতকাল এ ঘরেই কথা হয় তার সঙ্গে।

আলাপের শুরুতেই হাতে ধরিয়ে দিলেন তার শরীরের এক্স-রে রিপোর্ট। পর্যাপ্ত আলোতে কালো সেই রিপোর্ট ধরতেই ভেসে উঠল ছোট ছোট সাদা চিহ্ন। প্রথম দেখায় মনে হবে, কালো মাটির পাতিলে ফুটেছে বিন্নি ধানের খই! যা গুনে শেষ করার মতো না। হাবিব নিজেই বললেন, ‘ডাক্তার হিসাব কইরা দেখছে ২২০টা। চাইর-পাঁচটা গুলি বাইর হইছে। বাকিডি ভেতরেই আছে। যন্ত্রণায় রাইতে ঘুমাইতে পারি না। উঠি-বসি, এই পাশ-ওই পাশ কইরা রাইত পার হয়।’

সেদিন কী ঘটেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আন্দোলনে যাই নাই। আগের দিনের কাজের টাকা আনতে ঘর থাইকা বাইর হইছিলাম। লগে আরও দুইজন মিস্ত্রি। বাইর হওনের পরে দেহি পরিস্থিতি খারাপ। যার কাছে টাকা নিতে যাইতাছিলাম হেই লোক ফোন কইরা জানাইল পুলিশের গুল্লি খায়া চইলা গেছে। মেইন রাস্তায় আন্দোলন চলে দেইখা আমরা তিনজন চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের ভেতর দিয়া মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাই। এই সময়ে ওই এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি চলে। তাই আমরা চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের গেটেই দাঁড়ায়া থাকি। টাকা আর নিতে পারমু না এইটা বুইঝা গেছি। এমন সময় হঠাৎ কয়েকজন পুলিশের সামনে পড়ি আমরা। পুলিশ দেইখা লগে লগে দুই হাত উপ্রে তুইলা স্যালেন্ডার (স্যারেন্ডার) করি। কিন্তু কোনো কথা না হুইনাই পুলিশ আমাগো টার্গেট কইরা গুলি মারে। কতডি গুলি করেছে, তার হিসাব নাই। গুলি খায়া আমি রাস্তায় পইড়া যাই। গায়ের সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি রক্তে লাল হইয়া গেছিল। না ধুইলে আপনেরে দেহাইতে পারতাম।’ এরপর কত সময় গেছে সেটা মনে নেই। গুলিবিদ্ধ অস্থায় পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসেন এক চিকিৎসক।

পূর্বপরিচিত এই চিকিৎসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ওই ডাক্তার আমারে উদ্ধার কইরা দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়া যায়। ভর্তি নিতে চায় নাই সেখানে। ওই ডাক্তার নানা কিছু কইরা ভর্তি করাইছে। কিন্তু হাসপতালে ভর্তি থাকার প্রথম দুই দিন কোনো চিকিৎসা পাই না। নাপা ছাড়া কোনো ওষুধ দেয় নাই, স্যালাইনও কিনছি নিজের পয়সায়। দুই দিন পরে চিকিৎসা শুরু হয়। ছয় দিন চিকিৎসা নাই। এর মধ্যে গুলি লাগায় বাম চোখের অবস্থা খারাপ দিকে যাইতে থাকে। চোখের চিকিৎসার লাইগা আগারগাঁও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপতালে যাই। সেহানে চিকিৎসা তো পাইলামই না আরও অপারেশনের নাম কইরা চোখটাই নষ্ট কইরা দিছে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ছাড়াও আরও কয়েটা হাসপাতালে গেছি। তারাও অপারেশনের কথা কইছে। এর লাইগা প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাগব। কিন্তু আমার সেই সামর্থ্য নাই। তাই অপারেশন করাইতে পারতাছি না। আর অপারেশন করাইলেও চোখ ঠিক হইব কি না,  ডাক্তাররা কইতে পারে না।’

হাবিবের গায়ে যে গুলির চিহ্ন, একসময় পশুপাখি শিকার করার জন্য এ ধরনের ছররা গুলি ব্যবহার করা হতো। ছোট ছোট ধাতব বলের ভেতরে বারুদ ভরে তার ওপর প্লাস্টিকের আচ্ছাদন দিয়ে একেকটি ছররা তৈরি হয়। একেকটি কার্তুজে সাড়ে  চারশো ছররা (ধাতব বল) থাকে।

দিনমজুর হাবিব খান ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরলেও জীবন-জীবিকা নিয়ে পড়েছেন বিপদে। প্রায় অকেজো শরীর আর আলোহীন এক চোখ নিয়ে এক মাসের বেকার জীবন তার। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বললেন, ‘অনেকেই সাহায্যের আশ্বাস দিছে। কাগজপত্র নিছে কিন্তু এক পয়সার সাহায্য পাই নাই। চায়ের দোকানে যায়া খাড়াইতে পারি না। আগে নিজে খাইছি, অন্যরে খাওয়াইছি। এহন নিজের লাইগা এক কাপ অর্ডার করতে পারি না। এই অবস্থা দেইখা অনেকেই খাওয়াইতে চায়। আমার বিষয়ডা ভালা লাগে না।’

ধরা গলায় কথাগুলো বলছিলেন হাবিব। নিজেকে সামলে চুপ হয়ে গেলেন। এতক্ষণ টুকটাক কথা বললেও এবার মুখ খুললেন তার স্ত্রী সুখী বেগম। তিনি বলেন, ‘একটা নিরপরাধ মানুষরে রাস্তায় পাইয়া গুলি কইরা দিল। হ্যায় তো কাজে যাইতে পারতাছে না। দুইডা বাচ্চা লইয়া কেমনে কী হইব? চিকিৎসা চালাইব কেমনে? এহন পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা খরচ হইছে। এর মইধ্যে ৪০ হাজার টাকা ঋণ। ভাই, দেশ তো স্বাধীন হইল। আমাগো কী কিছু হইব?’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত