পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও তার ছেলে জুহায়ের সারার ইসলাম, মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান, আলোচিত কারসাজিকারক মো. আবুল খায়েরসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়েছে।
তবে এসইসি চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব স্থগিতের পাশাপাশি ব্যাংকে থাকা লকার সুবিধাও আগামী ৩০ দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ব্যাংকগুলো এ নির্দেশ দিয়েছে।
ব্যাংক হিসাব স্থগিতের এই তালিকায় থাকা অন্য ব্যক্তিরা হলেন পুঁজিবাজারের আলোচিত ব্যক্তি জাভেদ এ মতিন, সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি সিডব্লিউটির মনিজা চৌধুরী, মো. দেলোয়ার হোসাইন ও শরিফুল ইসলাম। ব্যাংক হিসাব স্থগিত থাকা মো. দেলোয়ার হোসাইন ও শরিফুল ইসলামের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।
বিএফআইইউর এ-সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ব্যক্তি ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে অতীতে ও বর্তমানে কোনো হিসাব থাকলে তা ৩০ দিনের জন্য স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এসব হিসাবের বিস্তারিত তথ্য পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিএফআইইউর কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। বিএফআইইউ বলেছে, আগামী ৩০ দিন এসব ব্যক্তি ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কোনো লেনদেন করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তের প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাবে লেনদেন স্থগিত রাখার সময় বাড়ানো হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, স্থগিত করা সব ব্যাংক হিসাবের সংশ্লিষ্ট তথ্য বা দলিল, যেমন হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি ও লেনদেন বিবরণী প্রভৃতি তথ্যসংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চিঠি দেওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিএফআইইউর কাছে পাঠাবে।
২০২০ সালের ১৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম প্রথমবার এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর গত ২৮ এপ্রিল পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও চলতি বছরের ২৮ মে তাকে ৪ বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পুঁজিবাজারে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই নানাভাবে বিতর্কিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এই অধ্যাপক। আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন অপরাধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বেপরোয়া ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে পুঁজিবাজারের কারসাজিকারকদের অনৈতিক সুবিধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। অপরাধের জন্য কারসাজির চক্রকে সঙ্গে নিয়ে বিশাল অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটে কমিশনের ভেতরের কর্মকর্তা, স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কারসাজিকারক, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী আমলা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা রয়েছেন।
পুঁজিবাজারে গত কয়েক বছরে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে যেসব ব্যক্তি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জাভেদ এ মতিন, আবুল খায়ের ও ছায়েদুর রহমান অন্যতম।
এ ছাড়া এসইসির গত দুই কমিশনের সহায়তা পুঁজিবাজার থেকে নানা সুবিধা পেয়ে আলোচনায় ছিলেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ, এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, পরিচালক আদনান ইমাম, তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন শুজের মালিক মিজানুর রহমান, জাতীয় ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ তার ভাই এবং পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্যে জাভেদ এ মতিন ছিলেন সাকিব আল হাসানের ব্যবসায়িক অংশীদার। সাকিব আল হাসান, জাভেদ এ মতিন, ফরচুন শুজের মিজানুর রহমান, এসএম পারভেজ তমাল ও আদনান ইমামরা ছিলেন শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে গড়ে ওঠা চক্র। কারসাজির মাধ্যমে তারা বিভিন্ন শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের ভুয়া ভর্তি, ব্যাপক সমালোচিত পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে সমালোচিত হন তিনি। এ ছাড়া ছাগলকা-ে চাকরি হারানো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মতিউর রহমানকে শেয়ারবাজারে সব ধরনের সহায়তা করেন শিবলী রুবাইয়াত।
এসইসির আগে তিনি সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একাধিকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য এবং কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন। পাশাপাশি বাণিজ্য অনুষদের ডিন হিসেবে চারবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
