চট্টগ্রামের অস্ত্রধারী সেই ৮ যুবকের বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৪, ১০:৪১ এএম

চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে পাঁচ শিক্ষার্থীসহ সাতজনকে হত্যার অভিযোগে যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবকলীগ পরিচয়ধারী অস্ত্রধারী সেই ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।  

৩ আগস্ট অটোরিকশা চালক শহীদুল ইসলাম নিহত হওয়ার ঘটনায় তার ভাই শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। সোমবার (১৯ আগস্ট) রাতে নগরের চান্দগাঁও থানায় এই মামলা দায়ের করা হয়।

গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ সময় অটোরিকশা চালক  শহীদুল ইসলাম নিহত হন। নিহত অটোরিকশা চালকের বাড়ি বাকলিয়া থানার রসুলবাগ আবাসিক এলাকায়। তার বাবার নাম রফিকুল ইসলাম।

মামলায় আসামিরা হলেন- মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা মহিউদ্দিন মাহমুদ, মোহাম্মদ জালাল ওরফে ড্রিল জালাল, যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ ফরিদ, ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ তাহসিন, যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ জাফর, ও মো. ফিরোজ, এইচ এম মিঠু ও মোহাম্মদ দেলোয়ার।

মামলার এজাহারে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যা সোয়া ৭ টার দিকে বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার থেকে তরিতরকারি কিনে বাসায় ফেরার পথে বহদ্দার বাড়ি মসজিদের সামনে আসামিরা শিক্ষার্থীদের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হন শহিদুল। তাকে উদ্ধার করে নগরের পাঁচলাইশ থানার অদূরে বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শহীদুল ইসলাম।

এর আগে গত ১৬ আগস্ট অস্ত্রধারী এই ৮ যুবকের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এছাড়া গত ১৮ জুলাই বিকালে বহদ্দারহাট মোড়ে গুলিতে তানভীর ছিদ্দিকী নামে এক শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় তানভীরের চাচা মোহাম্মদ পারভেজ বাদী হওয়া ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন। নিহত তানভীর ছিলেন আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী। একই মামলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তারুয়া এবং পথচারী মুদি দোকানকর্মী সাইমন ওরফে মাহিন হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে হুকুমের আসামি এবং অন্যদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসামি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মামলায় আসামিদের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তিনজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় যারা প্রকাশ্যে গুলি ছুড়েছিল, তাদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

চান্দগাঁও থানার ওসি জাহিদুল কবীর জানান, অস্ত্রধারী ৮ যুবককে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশ হন্যে হয়ে তাদের খুঁজছে।

গত ১৬ আগস্ট দায়ের করা মামলায় আসামি হয়েছেন চান্দগাঁও ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. এসরারুল হক, জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন ও চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনু। সুমনকে আসকারদীঘির পাড় ও এনায়েত বাজার এলাকায় অস্ত্রধারীদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করতে দেখা গেছে। কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনু চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব-৭। পরে জামিনে এসে বনে যান ওয়ার্ড কাউন্সিলর। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকেই এই তিন কাউন্সিলর আত্মগোপনে চলে  গেছেন।

সবশেষ গত সোমবার দায়ের করা মামলার আসামি যুবলীগ নেতা নামধারী ফিরোজ ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবে ২০১১ সালের  ফেব্রুয়ারি ও ২০১৩ সালের জুলাইয়ে অস্ত্রসহ দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে যুবলীগের সন্ত্রাসী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। পুলিশ জানায়, ১৬ ও ১৮ আগস্ট মুরাদপুর এবং বহদ্দারহাটে  মোড়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে শটগান দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন  স্বেচ্ছাসেবক লীগের  মো. দেলোয়ার, রিভলবার থেকে গুলি ছুড়েছিলেন যুবলীগের ফিরোজ, এইচএম মিঠু, মো. তাহসিন ও মো. জাফর।

মহানগর পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্রধারী সরকার পতনের আগে এলাকায় প্রকাশ্যে অবস্থান করলেও সরকার পতনের পর তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন।

পুলিশ জানায়, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের আগে ১৬ জুলাই বিকালে মুরাদপুর এলাকায় যুবলীগের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান নগরের শুলকবহর এলাকার ফার্ণিচার দোকানের কর্মচারী মো. ওমর ফারুক। একইদিন ছাত্রলীগের ছুরিকাঘাতে নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম। একইদিন আন্দোলন চলাকালে গুলিতে নিহত হন মো. ফয়সাল আহমেদ শান্ত নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি নগরের ওমর গণি এমইএস কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি বরিশালে, চট্টগ্রামে তিনি পতেঙ্গা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

১৮ জুলাই বিকালে বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় স্থানীয় মুদি দোকানের কর্মচারী ১৪ বছরের কিশোর সাইমন।

গত ২৩ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র হৃদয় চন্দ্র তারুয়া (২২) । ১৮ জুলাই নগরের বহদ্দারহাটে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সেদিন বিকেলে বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মোহাম্মদ ইমাদ (১৮) নামে এক শিক্ষার্থী। একই দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তানভীর ছিদ্দিকী নামে আরেক শিক্ষার্থী।

সবশেষ গত ৩ আগস্ট বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরেরদিন ৪ আগস্ট নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিএনজি অটোরিকশা চালক শহীদুল ইসলাম (৩৭) ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত