৩০ বছর পর হঠাৎ কেন বন্যা?

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৪, ১১:৩২ এএম

ভারত থেকে আসা পানিতেই ডুবে দেশ। সুনামগঞ্জের হাওরের বন্যা, সিলেটে উজানের পানি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিলেটের পানি এবং সর্বশেষ কুমিল্লা ও ফেনীর বন্যার পানি কিন্তু ভারত থেকেই এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো এই পানি কখনো আসে কখনো আসে না। কিংবা বিগত ৩০ বছরে আসেনি এবার কেন এলো?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছিল দেশের বিশিষ্ট পানি বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আইনুন নিশাতের কাছে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ষাটের দশকে কাপ্তাই ড্যাম নির্মাণের আগে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এমনকি কখনো কখনো চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা হতো। কিন্তু কাপ্তাই ড্যাম নির্মাণের পর সেই বন্যা আর হয় না। যদি কোনো বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কাপ্তাই হ্রদের ধারণ ক্ষমতার বেশি পানি ড্যামের ভেতরে জমা হয় তখন ড্যামের গেট খুলে দেয়া হয় এবং ভাটিতে থাকা রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যা হয়ে থাকে।’

এদিকে কাপ্তাই ড্যামের কারণে কর্ণফুলীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর ভাটিতে পলি জমে জায়গায় জায়গায় চর জেগে নদীর গভীরতা কমে গিয়েছে। ফলে কখনো অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হলে তা ধারণ করতে পারে না কর্ণফুলী। নদী উপচে পানি উভয় তীরে প্লাবিত করে। ঠিক তেমনিভাবে কুমিল্লার দুঃখ বলে বিবেচিত গোমতি নদীর বাঁধ যখন প্রতিবছর বর্ষায় ভাঙ্গতো তখন নদীর উভয় তীরের বাঁধ সংরক্ষণ করতো পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রতিবছর বাঁধ মেরামত করতো এবং নদীর যেখানে বাঁক থাকতো সেখানে সিমেন্টের ব্লক ফেলে পানির স্রোতের আঘাত থেকে বাঁধকে রক্ষা করতো। কিন্তু গত ৩০ বছর ধরে যেহেতু নদীতে পানি বাড়ছিল না নদীর উভয়তীরের বাঁধ মেরামতের কাজও হয়নি। ভরাট হয়ে গেছে নদী।

বাঁধ সংস্কার কার্যক্রমে ধীরতা থাকার কথা স্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্বজোন) এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে বাঁধ সংস্কারসহ নদীর গভীরতা বাড়াতে তেমন কাজ করা হয়নি এটা সঠিক। এখন আমরা একটি ডিটেইল পরিকল্পনা করছি।’

দীর্ঘ ৩০ বছর কি বেশি বৃষ্টি হয়নি? আর বৃষ্টি হলে তো নদীতে পানি বাড়ার কথা ছিল। এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে সেইসব বৃষ্টির পানি গোমতির উজানে ডুম্বুর বাঁধ আটকে রাখতে পেরেছে। ফলে আমরা গত ৩০ বছর বন্যা পাইনি। এখন তারা তাদের বাধঁ রক্ষার স্বার্থে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্ত:নদীগুলোর বাঁধ খুলে দেয়ার আগে ভাটির দেশকে জানাতে হয়।’

এদিকে কুমিল্লায় যখন বন্যা দেখা দিচ্ছে তখন ফেনী ও নোয়াখালী পানিতে ডুবন্ত। উজানের ত্রিপুরায় অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকার পানিগুলো ডাকাতিয়া, কাঁকড়ি, ফেনী ও মুহুরী নদী দিয়ে প্রবেশ করে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টির করে। তবে এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী বন্যা নয় দাবি করে বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (হাইড্রোলিক রিসার্চ) পিন্টু কানুনগো বলেন, ‘পূর্বাঞ্চলের এই এলাকার বন্যা আকস্মিক। অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই বন্যার পানি বৃষ্টি কমলেই সাগরে নেমে যাবে।’

অপরদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাদেকুর রহমান আবহাওয়া পরিস্থিতির সুখবর দিয়ে বলেন, ‘আজকের পর থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করেছে। শুধু আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল নয়, ভারতের ত্রিপুরায়ও কমছে বৃষ্টি। ফলে বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাবে।

উল্লেখ্য, গত কিছুদিন ধরে প্রবল বৃষ্টিতে দেশের ফেনী ও নোয়াখালীতে প্রবল বন্যা দেখা দিয়েছে। এছাড়া কুমিল্লার গোমতি নদীর বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় সেখানেও বন্যা চোখ রাঙ্গাচ্ছে। ভারতের ত্রিপুরা জেলার গোমতি উপজেলার ডুম্বুর নামক স্থানে গোমতি নদীর উপরে নির্মিত বাঁধটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১২০ কিলোমিটার উজানে। ১৯৭০ সালে এই বাঁধ নির্মিত হয়েছিল সেখানকার কৃষি ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য। পরবর্তীতে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও নির্মাণ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত