‘সত্যি বলতে, মাইলফলক আমার জন্য কেবল একটি সংখ্যা। যতক্ষণ পর্যন্ত দলে অবদান রাখতে পারছি, বিশেষ করে সেঞ্চুরি করতে, সেটাকে বড় সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারছি এবং দিনশেষে সেটি যেন ম্যাচ জেতানো ইনিংস হতে পারে আমার লক্ষ্য সবসময় এটিই থাকে।’ ৫২২ মিনিট ক্রিজে থেকে ৩৪১ বল খেলে ১৯১ রানের চোখ জুড়ানো ইনিংস খেলার পরও শেষ দিন মাঠে নামার আগে এ কথাগুলোই বলছিলেন ৩৭ বছরের মুশফিকুর রহিম। এবার চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরি হাতছাড়া হলেও মুশফিকের টেস্ট জেতার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। রাওয়ালপিন্ডির এ ঐতিহাসিক জয়ের ভিত যে তিনিই গড়ে দিয়েছেন।
৮৯তম টেস্টে এমন কাব্যিক ইনিংসের পথে তামিম ইকবালকে ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি ও রানের রেকর্ড নিজের করে নেন মুশফিক। ক্যারিয়ারে তৃতীয়বার উইকেটে কাটান ৫০০ মিনিট। সাদা পোশাকে দেশের সর্বোচ্চ ৭ম বার ম্যাচসেরাও হয়েছেন মুশফিক। বাংলাদেশের আগামী টেস্ট সূচি ও মুশফিকের শারীরিক সক্ষমতা বিচারে আনলে দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে শততম টেস্ট খেলার সুবর্ণ সুযোগ তার সামনে। গতকাল ম্যাচসেরার পুরস্কার নেওয়ার পর সঞ্চালক যখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ সেঞ্চুরি পাওয়া মুশফিককে দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার বলে সম্বোধন করেন তাতে গর্বিত না হয়ে বরং কৃতিত্বটা দলের সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে দেখা যায়। মুশফিকের ভাষ্যে, ‘আমি কখনো চিন্তা করি না আমি এই দলের সবচেয়ে বয়স্ক বা আমি সবচেয়ে অভিজ্ঞ। কারণ আমি যখন এই দলের সঙ্গে যুক্ত হই তখন আমাদের কাছে দেশের হয়ে আরেকটি টেস্ট খেলার সুযোগ হয় এবং আমি কেবল আমার শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করি এবং মাঠেও তাই। আমি দলের জন্য অবদান রাখি এবং দলের বাকিদের থেকে অনুপ্রাণিত হই। ঠিক এই কারণেই আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে। আমার একাগ্রতা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।’
মুশফিকুর রহিম দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে আবেগ প্রদর্শনের জন্য যেমনভাবে সমালোচিত হয়েছেন তেমনি ক্যারিয়ার জুড়ে প্রশংসিত হয়েছেন একাগ্রতা, পরিশ্রম, সততা ও নিবেদনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়ে। অনুশীলনে সবার আগে আসা, হাড়ভাঙা পরিশ্রম, সবার শেষে ফেরা এ সবই মুশফিকের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে নিত্যদিনের উদাহরণ। ৩৭ বছরে এসেও রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের আগে নিজেকে গড়তে মুশফিক যা করেছেন সেটিও নিশ্চিতভাবেই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে পরের প্রজন্মের কাছে। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা যখন ছুটিতে তখন এ বছরের মে মাসে বাংলা টাইগার্সের ক্যাম্পে যোগ দিয়ে টানা আড়াই মাস অনুশীলন করেন মুশফিক। এরপর বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সঙ্গে উড়ে আসেন পাকিস্তানে। বাংলা টাইগার্সের ক্যাম্প ও ‘এ’ দলের হয়ে সফর তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি কন্ডিশনের সঙ্গে ধাতস্থ হতে সাহায্য করেছে। অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন পাকিস্তানি বোলারদের বিপক্ষে। আবার যখন কৃতিত্ব ভাগের প্রসঙ্গ এসেছে, নির্দ্বিধায় বাংলা টাইগার্স ক্যাম্প ও তার পেছনে থাকা দেশি কোচদের স্মরণ করেছেন, ‘বাংলা টাইগার্স ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছিল দেশের মাটিতে। যেখানে স্থানীয় কোচেরা ছেলেদের প্রস্তুত করেছেন। এটি সমস্ত খেলোয়াড়ের প্রস্তুতির জন্য সত্যিই উপকারী ছিল। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটারদের।’ দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে অবশ্য বাংলা টাইগার্স ক্যাম্পের প্রধান কোচ সোহেল ইসলাম উল্টো মুশফিকের শৃঙ্খলা ও নিবেদনকেই এমন ইনিংসের নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
মুশফিকের তিন ডাবল সেঞ্চুরির দুটিতেই বাংলাদেশ টেস্ট জিতেছে। ড্র করেছে বাকিটি। এবার মুশফিক ডাবল সেঞ্চুরি না পেলেও তার নজরকাড়া ১৯১ রানে পাকিস্তানের মাটিতে প্রথম বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে বাংলাদেশ। ডাবল সেঞ্চুরি মিসের আক্ষেপ ভুলে গেলেও দেশের কথা ভোলেননি মুশফিক। ম্যাচসেরা হয়ে পাওয়া অর্থ পুরস্কারের পুরোটা উৎসর্গ করেছেন বন্যায় কষ্টে থাকা মানুষদের সাহায্যার্থে। আর চোখ রেখেছেন সামনের দিকে। প্রথম টেস্ট জয়ে অর্ধেক কাজ সমাপ্ত হলেও ৩০ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় টেস্টেও নিবেদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর মুশফিকুর রহিম। তাতে বড় দলের বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের ‘প্রথম’ ধরা দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
