স্বামী হারা মুক্তা রায় সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে আয়ার চাকরি নিয়ে ছিলেন । আর তাতে যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গেলেন তিনি। যাতে ঘষা দিতে আসতো টাকা। তাই অল্প দিনেই আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার মতো অবস্থা চলে যান তিনি। ১৫ বছরেই হয়ে যান অঢেল সম্পত্তির মালিক।
জানা যায়, সাবেক সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র ছত্রছায়ায় কোটিপতি হবার উত্থান মুক্তা রায়ের। সাবেক মন্ত্রীর ক্ষমতা দেখিয়ে হাসপাতালের টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বানিজ্য করতেন তিনি। আর তাতে আয়বর্হিভূত জায়গা জমি, ঢাকায় ফ্লাট, গাড়ির শোরুমসহ নামে বে-নামে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি।
কুরগাঁও সদর উপজেলার গড়েয়া ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তা রায়। তার স্বামী জজ কোর্টের মুহুরি ছিলেন । স্বামী মারা যাওয়ার পরে দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে আয়া পদে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। পরে আয়া পদ থেকে চাকরি ছেড়ে দেন।
সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের ছত্রছায়া হাসপাতালের সব নিয়ন্ত্রণ করতো দাপটের সাথে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাসপাতালের কেনাকাটা, খাবার, আউটসোর্সিং-এ নিয়োগ বাণিজ্য সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করত মুক্তা। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি তার বিরুদ্ধে।
তার বিরুদ্ধের সাংবাদিকদের হয়রানির করা অভিযোগও রয়েছে। জাানা যায়, করোনার সময় হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহে অনিয়ম নিয়ে ২০২১ সালের ৫ জুলাই সংবাদ প্রকাশ করে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি তানভীর হাসান তানু, নিউজ বাংলার প্রতিনিধি রহিম শুভ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি আব্দুল লতিফ লিটু। পরে ওই বছরের ১০ জুলাই তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। দুই সংবাদিক পালিয়ে বেড়ালেও গ্রেপ্তার হন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি তানু। ২৪ ঘণ্টা হাজতে থাকার পর সাংবাদিকদের আন্দোলনের মুখে জামিন দেন আদালত। ওই মামলার জন্য এখনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন তিন সাংবাদিক।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাট, কার রেন্ট এ সেন্টারের শো-রুম, ঠাকুরগাঁও পৌরশহরের ইসলামবাগে দুই তলা বাড়ি, শান্তিনগরে দুই জায়গায় প্লট আকারে ৫ শতক করে জমি, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলএসডি গোডাউনের পাশে ১০ শতক জমি, পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের পাশে রেস্টুরেন্ট, সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের বাদুপাড়ায় বাড়ি- জমি ও সয়াবিন তেলের কারখানা, চন্ডিপুরে জমিসহ বাড়ি, মিল-চাতাল ও পুকুর ২ কোটি ৮ লাখ টাকায় কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা অগ্রীম, আবাদি জমি রয়েছে ২০ বিঘা। সদরের গড়েয়া বাসস্ট্যান্ডে ৮ শতক জমির উপরে রয়েছে তার বাড়ি।
এ ছাড়াও নিয়োগ বাণিজ্য,জমি দখলসহ নামে-বেনামে সম্পত্তি ও বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোল্ডার রয়েছেন। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নওগাঁর অটো রাইস মিল কয়েক কোটি টাকায় কিনেছেন এই মুক্তা রায়।
চলতি বছরে মুক্তা রায়ের দুই ছেলে তূর্য ও মাধুর্য এন্টারপ্রাইজ নামে পূবালী ব্যাংক হিসাব নম্বরে লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি ৩৮ লাখ ২০৯৯ টাকা। সাবেক মন্ত্রী ও এমপি রমেশ চন্দ্র সেন আটক হওয়ার পরদিন সব টাকা তুলে নেন মুক্তা। বর্তমানে তার একাউন্টে রয়েছে ৬ হাজার ৪১৭ টাকা।
এ ছাড়াও জনতা,অগ্রণী ও সোনালী ব্যাংকেও তাদের হিসাব নম্বরে দুই বছরে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
নিজের আখের গুছিয়ে ক্ষান্ত হননি এই মুক্তা রানী। ভাইদেরকে রাজনীতিতে যুক্ত করে ঠিকাদারি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে দেন। আর ভাতিজা-ভাতিজিদের সরকারি চাকরিও নিয়ে দিয়েছেন এই মুক্তা রানী।
হত্যা মামলায় ভারতে পলাতক থাকা বড় ভাই নারায়ণ ঠাকুরকে দেশে ফিরিয়ে এনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত করেন। মন্ত্রীর প্রভাব আর রাজনৈতিক দাপটে তারা হয়ে উঠেন আরো প্রভাবশালী। তার খালাতো ভাই দুলালকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খালাতো বোনের ছেলে নিপুণকে হাসপাতালের ঠিকাদারি, বোনের মেয়ে মৌকে স্কুলের শিক্ষিকা, আরেক বোনের ছেলে জয়কে ফোর্সসহ রাজস্ব ও আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাকরি দিয়েছেন। দুই শতাধিক আত্নীয়-স্বজনকে চাকরি দেন মুক্তা রায়।
মুক্তা রায়ের খালাতো ভাই ফণি রায় বলেন, ‘মুক্তার পারিবারিক অবস্থা খারাপ ছিল। শহরে ভাড়া বাড়িতে পরিবার থাকত। পরে নিজে বাড়ি কিনেছে। আমাদের আত্নীয়-স্বজনের চাকরি নিয়ে দিয়েছে। এলাকায় কিছু জমি কিনেছে।’
আরেক বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা সবাই তাকে এমপির দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে চিনতাম। তাদের বংশের সবার চাকরি হয়েছে। এলাকার স্কুল গুলোতে অনেককে চাকরি দিয়েছে। তার বিনিময়ে টাকা নিয়েছে আবার কারো কাছ থেকে জমি লিখে নিয়েছে। পাশেই মিল চাতাল পুকুর ২ কোটি ৮ লাখ টাকায় কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা গত মাসে বায়নামা করেছে বলে শুনেছি।’
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা নুর নেওয়াজ আহমেদ বলেন ‘২০১০ সালে মুক্তা রায় আয়া পদে যোগদান করেন। পরে ২০১৪ সালে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন।’
এ বিষয়ে মুক্তা রায় বলেন, ‘রমেশ চন্দ্র সেনের সাথে একটা ভাল সম্পর্ক ছিল সেটা সত্যি। রমেশ চন্দ্র সেন কি আপনি স্বামী এমন প্রশ্ন করলে তিনি অস্বীকার করেন। কিন্তু আমি ব্যবসা বাণিজ্য করে টাকা উপার্জন করেছি। সরকারকে কর প্রদান করেছি নিয়ম মাফিক। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা সত্য নয় বলে দাবি করেন মুক্তা রায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঠাকুরগাঁও সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক তাহসীন মুনাবীল হক বলেন, ‘আয় বহির্ভূত সম্পদ উপার্জনের কোনো সুযোগ নেই। কেউ এসবে জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। লিখিত অভিযোগ করলে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।’
শুধু উত্তরাতেই হারুনের যত সম্পদ
হাতিরঝিল থেকে নারী সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার
শেখ হাসিনাসহ ৫৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা
হারুনের দালানের খনি
বিক্ষোভে উত্তাল কলকাতা আধাবেলা ধর্মঘটের ডাক
ইনুকেও ডিম জুতা নিক্ষেপ, ৭ দিনের রিমান্ড