পরনিন্দা যেসব ক্ষতি ডেকে আনে

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪, ০২:১৯ এএম

গিবত বা পরনিন্দা মানব চরিত্রের একটি খারাপ বৈশিষ্ট্য। এটি সামাজিক শান্তি বিনষ্টকারী একটি ঘৃণ্য অপরাধ। অথচ এ মন্দ অভ্যাস বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গিবত খুবই জঘন্য ও নিন্দনীয় কাজ এবং এটি কবিরা গুনাহ। তাই এটা থেকে বিরত থাকা আদর্শ মানুষের কর্তব্য।

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় গিবত হলো, কোনো মুসলমানের অনুপস্থিতিতে তার সম্বন্ধে এমন কোনো দোষের কথা বলা, যা শুনলে সে মনে কষ্ট পায় এবং সে তা অপছন্দ করে। গিবত শুধু মুখের ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাচনিক কিংবা লেখনীর মাধ্যমে অথবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়েও হতে পারে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুল (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো গিবত কাকে বলে? সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুল ভালো জানেন।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘গিবত হলো তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে তার অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে এটিও কি গিবত হবে? উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাহলেই সেটি গিবত হবে। আর তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে সেটি হবে মিথ্যা অপবাদ।’ (সহিহ মুসলিম)

মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া : পবিত্র কোরআনে গিবত করাকে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকসংখ্যক অনুমান থেকে বিরত থাকো। কেননা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুমান তো পাপের কারণ হয়ে থাকে। আর তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অন্যের পশ্চাতে গিবত কোরো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণাই করো। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজুরাত ১২)। ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, একজন মানুষের জন্য অন্য মানুষের গোশত খাওয়াটা স্বভাবগতভাবেই ঘৃণ্য বিষয়। আর সেটা যদি আপন মৃত ভাই হয়, তবে তা কত জঘন্য!

রাসুল (সা.)-এর নিন্দা : আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, একদা আমরা রাসুল (সা.)-এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি সেখান থেকে উঠে চলে গেল। তার যাওয়ার পর আরেকজন তার সমালোচনা করল। তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘তোমার দাঁত খিলাল করো।’লোকটি বলল, ‘কী কারণে? আমি তো কোনো গোশত খাইনি।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি তো এইমাত্র তোমার ভাইয়ের গোশত খেয়েছ অর্থাৎ গিবত করেছ।’(তাবারানি ৪২৮)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে সুফিয়া (রা.)-এর দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, সে তো বেঁটে নারী। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি তো তার গিবত করে ফেললে।’ (মুসনাদে আহমাদ)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল বললেন, ‘তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যদি তা সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে সমুদ্রের পানির রং পাল্টে যাবে।’ (সুনানে আবু দাউদ)

ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক : আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘গিবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এটি কীভাবে হয়? তিনি বললেন, ‘কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে আল্লাহ তা কবুল করলে সে ক্ষমা লাভ করতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি গিবত করলে, যার গিবত করা হয়েছে সে ক্ষমা না করলে আল্লাহও তাকে ক্ষমা করবেন না। (তাবারানি)

মৃত মানুষের গিবত : জীবিত মানুষের গিবত করা যেমন হারাম তেমনি মৃত মানুষের গিবত এবং তার দোষচর্চা করাও হারাম। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ মৃত্যুবরণ করে তখন তাকে তার অবস্থার ওপরই ছেড়ে দাও। কোনো অবস্থাতেই নিজেকে তার গিবত ও দোষচর্চায় লিপ্ত কোরো না। মৃতদের গালমন্দ কোরো না। কেননা এখন তারা তাদের কর্মফল ভোগ করছে।’ (তারগিব ওয়া তারহিব)

ইমানের পরিপন্থী : গিবত করা ইমানের পরিপন্থী কাজ। গিবতকারীর মুখে ইমানের কথা স্বীকার করলেও অন্তরে তাদের সত্যিকারের ইমান নেই। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুল (সা.) মিম্বারে আরোহণ করে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের যারা শুধু মুখেই ইমান এনেছে; কিন্তু ইমান তাদের অন্তরে এখনো প্রবেশ করেনি। শুনে রাখো, তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না এবং তাদের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করবে না। কেননা যে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে, আল্লাহও তার দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর মহান আল্লাহ যার দোষত্রুটি অনুসন্ধান করবেন, তাকে তিনি লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন, সে তার বাহনের পেটের মধ্যে অবস্থান করলেও।’ (তিরমিজি)

গিবত নিকৃষ্ট সুদ : এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, সুদ এতটাই নিকৃষ্ট গুনাহ যে, তার মধ্যে অসংখ্য অনিষ্ট রয়েছে। এই সুদ অনেক গুনাহের সমষ্টি। সুদের পাপের ৭২টি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর হলো কোনো পুরুষ কর্র্তৃক তার আপন মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তুল্য পাপ। সুদের মতো এত শক্ত কঠিন কথা অন্য কোনো গুনাহের ব্যাপারে বলা হয়নি। অথচ গিবত সেই সুদেরই নিকৃষ্টতম স্তর। এরপর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট সুদ হলো অন্যায়ভাবে কোনো মুসলমান তার অন্য মুসলমান ভাইয়ের সম্মানহানি করা অর্থাৎ গিবত করা।’ (সুনানে আবু দাউদ)

গিবতের দুর্গন্ধ : জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে এক মজলিসে বসা ছিলাম। তখন হঠাৎ একটি দুর্গন্ধময় দূষিত বায়ু উত্থিত হলো। রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কি জানো, এটি কীসের দুর্গন্ধ? এটি ওইসব লোকের দুর্গন্ধ যারা মুমিনদের গিবত বা পরনিন্দা করে।’ (মুসনাদে আহমাদ) আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে : মহান আল্লাহর বিরাগভাজনে পরিণত হওয়ার যত কারণ আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো পরনিন্দার চর্চা। অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই গিবতে লিপ্ত হয়ে যায়। বেলাল ইবনে হারেছ আল মুজানি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক এমন কথা বলে, যার পরিণতি সম্পর্কে সে চিন্তাও করে না যে, তা কোন পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছবে। অথচ এ কথার কারণে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত সেই ব্যক্তির জন্য অসন্তুষ্টি লিখে দেন।’ (তিরমিজি)

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের দোষচর্চা বেশি করে, অন্যদের তুলনায় সে অধিক পাপী হয়।’ আর যার পাপ বেশি হয়, সে সর্বাধিক নিকৃষ্ট বান্দায় পরিণত হয় এবং আল্লাহ তার প্রতি সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট হন।

গিবতকারীর দোয়া কবুল হয় না : যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের গিবত ও দোষচর্চায় লিপ্ত থাকে আল্লাহর দরবারে সে এতই ঘৃণ্য ব্যক্তিরূপে চিহ্নিত হয় যে, তার কোনো দোয়া কখনো কবুল হয় না এবং তওবা করার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে সে বঞ্চিত থাকে।

নেক আমল কবুল হয় না : গিবতের কারণে অসৎ কাজের পরিমাণ বেড়ে যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা গিবত থেকে দূরে থাকো। কেননা গিবতের মধ্যে তিনটি মহাক্ষতি রয়েছে। এক. গিবতকারীর দোয়া কবুল হয় না; দুই. তার নেক আমল গ্রহণ হয় না; তিন. তার আমলনামায় পাপ বর্ধিত হতে থাকে।’ (খাজানাতুর রিয়াজাত)

আসুন আমরা গিবতের মতো সামাজিক অপরাধ থেকে নিজেদের নিবৃত্ত রাখি এবং এর ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিজ ও সমাজকে রক্ষা করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত