চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতির পদ কাজে লাগিয়ে ২০০৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বন্দর-পতেঙ্গা আসনে নৌকার টিকিট পান তিনি। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে চমকে দেন সবাইকে। এরপর ১৫ বছরে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে তার দাপট। নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব সবই তিনি হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন। দুহাতে কুড়িয়েছেন টাকা। অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বন্দর, চেম্বার, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সব জায়গায় বিস্তার করেন একাধিপত্য। আওয়ামী লীগ সরকার এখন আর নেই, অবসান হতে চলেছে তার দাদাগিরির।
এত গুণের (!) অধিকারী মানুষটি হলেন চট্টগ্রামের বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সাবেক এমপি এবং চট্টগ্রামের রাজনীতি ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে আলোচিত-সমালোচিত এমএ লতিফ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তারপর তিনি গিয়েছিলেন আত্মগোপনে। কিন্তু সেখান থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসে ক্ষুব্ধ জনতা। তুলে দেয় সেনাবাহিনীর হাতে। এখন তিনি কারাগারে। তবে চেম্বার সভাপতির চেয়ারে থাকা পুত্রের মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রাম চেম্বার দিয়েই মূলত উত্থান এমএ লতিফের। ২০০৮ সালে চেম্বার সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। তখন লোকজন তাকে চিনত জামায়াতপন্থি হিসেবে। অদৃশ্য শক্তির বদৌলতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১৯ দিন আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকার মনোনয়ন পান তিনি। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে হারিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালেও নৌকার টিকিটে কখনো বিনা ভোটে আবার কখনো কেন্দ্র দখল করে জিতে যান তিনি। এমপি হওয়ার পর আমূল পরিবর্তন আসে তার আচরণে। সিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বন্দরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তার দুর্ব্যবহার এখনো আলোচনার প্রসঙ্গ।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বেসরকারি বিমান সংস্থার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসেন এমএ লতিফ ও সিএমপির তৎকালীন একজন উপপুলিশ কমিশনার। এমপিকে চিনতে না পারায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে চরমভাবে নাজেহাল করেন তিনি। একই বছর চট্টগ্রাম বন্দরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ধমক দিয়ে তিনি বলেন, ‘শাট আপ, আই এম আ মেম্বার অব দ্য পার্লামেন্ট’। লতিফের এসব ঘটনা তখন পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল।
চেম্বার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ক্ষমতাসীন দলের এমপি হয়ে ২০০৯ সাল থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন লতিফ। নিজের লোকজনকে ভোটার বানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের ভোটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। গড়ে তোলেন চেম্বার সিন্ডিকেট। ২০০৯ সালে লতিফের সঙ্গে সমঝোতা করে চেম্বার সভাপতি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম। পরের নির্বাচনে তার সমর্থনে সভাপতি হন মাহবুবুল আলম। নতুন পরিচালনা বোর্ড হলেও তার সমর্থনে টানা ১০ বছর সভাপতি ছিলেন মাহবুবুল আলম। মাহবুবুল আলমের সময়ে চেম্বারের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক ছিলেন এমএ লতিফ।
চেম্বারের অর্থায়নে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মিত হলেও নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে স্পেস বরাদ্দ দিতেন লতিফ। চেম্বার ছিল তার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান। চেম্বারের পুরনো ভবনটিও রেখেছিলেন নিজের দখলে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার স্টল বরাদ্দের নামে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন প্রতি বছর।
টানা পাঁচবারের সভাপতি মাহবুবুল আলম এফবিসিসিআইর সভাপতি নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি করা হয় এমএ লতিফের ছেলে ওমর হাজ্জাজকে। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তার আরেক ছেলে ওমর মুক্তাদির। এ ছাড়া ২৪ সদস্যের পরিচালনা বোর্ডে লতিফের আরও কয়েকজন আত্মীয় রয়েছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চেম্বারকে পরিবারতন্ত্রমুক্ত করার আন্দোলন শুরু করেছে একাধিক ব্যবসায়ী গ্রুপ। চেম্বারের সাবেক একাধিক সভাপতির সমর্থন রয়েছে তাদের প্রতি। চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এসএম নুরুল হকের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ ‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ’ ব্যানারে প্রথমে আন্দোলন শুরু করলেও পরে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এসএম সায়ফুল আলমের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের আরেকটি গ্রুপ বঞ্চিত ব্যবসায়ী ফোরামের ব্যানারে পৃথকভাবে আন্দোলনে নেমেছে। লতিফের আশীর্বাদপুষ্ট বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগ চাইছেন তারা। কয়েকজন পদত্যাগ করেছেন যদিও, এখনো সভাপতির চেয়ারে আছেন লতিফপুত্র ওমর হাজ্জাজ।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এসএম নুরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৫ বছর ধরে এমএ লতিফ চেম্বারকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন; নেতৃত্ব নির্বাচনের সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। লতিফ আর মাহবুবুল আলম মিলে ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনের চেম্বারে পরিণত করেছেন, ব্যবসায়ীদের রাখেননি। চেম্বারকে পরিবারতন্ত্রমুক্ত করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের ব্যবসায়ীদের চেম্বার করতেই আমাদের আন্দোলন।’
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চেম্বারে যাননি সভাপতি ওমর হাজ্জাজ। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তিনি।
চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর থেকে চট্টগ্রাম চেম্বার কার্যত স্থবির। পরিচালনা বোর্ডের কোনো সভাও হয়নি। ব্যবসায়ীরা চেম্বারে সংস্কারের দাবি তুলেছেন। আমিও মনে করি চেম্বারে সংস্কার প্রয়োজন। কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আমরা আন্দোলনরত ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করব। তবে অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ব্যবসায়ীরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে চেম্বার প্রশাসক বসালে কোনো লাভ হবে না।’
চট্টগ্রাম চেম্বার ছাড়াও সংসদ সদস্য ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার সুবাদে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসার বেশির ভাগই ছিল এমএ লতিফের নিয়ন্ত্রণে। তার সন্তুষ্টির বাইরে গিয়ে ব্যবসা করা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। বন্দরের অনেক কর্মকর্তাও তাকে সমীহ করে চলতেন। বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার অপারেটর নিয়োগেও এমপি হিসেবে লতিফের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি বড় ফ্যাক্টর ছিল। নৌপথে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) ঘিরে চলত লতিফের বাণিজ্য।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় এমএ লতিফ তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৭৪ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা। অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ৫ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৭০৬ টাকার। ব্যাংকে জমা দেখান ৪২ লাখ ৪২ হাজার ৬২৩ টাকা আর হাতে নগদ দেখিয়েছেন ২ কোটি ৩৭ লাখ ৯০ হাজার ৮৬১ টাকা। ব্যবসাকে আয়ের উৎস উল্লেখ করে আয় দেখিয়েছেন ২০ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৪ টাকা, সম্মানী ভাতা থেকে ২৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৫ টাকা, কৃষি থেকে ১৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৪৭ টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪১১ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, লাইটারেজ জাহাজ, ভোগ্যপণ্য আমদানি, আবাসনসহ এমএ লতিফের দৃশ্যমান বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম চেম্বার তার আয়ের বড় উৎস। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া সম্পদের হিসাব পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে এরশাদ নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে আহত করার ঘটনায় ডবলমুরিং থানায় এমএ লতিফসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন তিনি কারাগারে।
