পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে শুরু করে চিকিৎসালয়, হাসপাতালের চিকিৎসক ও অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তি সবখানেই অস্থিরতা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখলে ছিল দলটির সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ)। ফলে এখন তারা রয়েছেন দখল হারিয়ে ওএসডি ও বদলি হওয়ার আতঙ্কে। অন্যদিকে ২০০৯ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য খাতে নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। বছরের পর বছর পদোন্নতি না পাওয়া ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হারানো ড্যাব নেতারা মরিয়া হয়ে নেমেছেন পদ দখলের লড়াইয়ে। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। আর পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে স্বাস্থ্য খাত।
ইতিমধ্যে ড্যাবের দাবি মেনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। তার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক রোবেদ আমিন। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অসংক্রামক রোগের বিস্তার বন্ধে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নন কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নার স্থাপনে ভূমিকা রাখেন, যা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে সরকার নিয়োগ দিলেও এক সপ্তাহ ধরে ড্যাবের বাধায় অধিদপ্তরে ঢুকতে পারছেন না অধ্যাপক রোবেদ। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জানিয়ে বিক্ষোভ করছে ড্যাব। মূলত আওয়ামী লীগ সরকার ও স্বাচিপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ড্যাব।
শুধু তাই নয়, ড্যাবের চিকিৎসকদের আন্দোলনের মুখে ওএসডি করা হয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক টিটো মিয়া এবং দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক বায়েজিদ খুরশীদ রিয়াজ ও অধ্যাপক কামরুল হাসান মিলনকে। এর মধ্যে কামরুল হাসান স্বাচিপের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং অন্য দুজনও স্বাচিপের সক্রিয় নেতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক আহমেদুল কবীরকে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনাকে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) পরিচালক করা হয়েছে। তবে ড্যাবের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের কারণে নিপসমে ঢুকতে পারছেন না মীরজাদী সেব্রিনা। তারা সবাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন বলে আভিযোগ ড্যাব নেতাদের। দেশে স্বাস্থ্য খাতের বেশিরভাগ কাজ চলে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির মাধ্যমে। এ তিনটি খাতে রয়েছে ৩১টি বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা। ড্যাব চাচ্ছে এ বিভাগগুলোর প্রধান হিসেবে নিজেদের দলীয় লোকজনকে বসাতে।
একই অবস্থা দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়েও (বিএসএমএমইউ)। গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পরদিন থেকে ড্যাবের নেতাকর্মীরা দখলে নেন বিএসএমএমইউ। ড্যাবের তোপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দীন মো. নূরুল হক এবং দুই উপ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও ডিনের দায়িত্বে থাকা স্বাচিপ অনুসারী নেতাদেরও পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। ভয় ও আতঙ্কে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে স্বাচিপের নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে না।
পদত্যাগ করার আগে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের জিম্মি করে নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি ও বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণের স্বাক্ষর নিয়েছেন ড্যাবের নেতারা। বিএনপির শাসনামলে নিয়োগ পাওয়া ১৭৩ জন চিকিৎসকের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে একদিনে। শুধু তাই নয়, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ১৮ আগস্ট উপাচার্যের পদত্যাগ করার আগপর্যন্ত বিএসএমএমইউতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন ‘বঞ্চিত’ ২১৩ জন। এ ছাড়া পদোন্নতি নিয়ে অধ্যাপক হয়েছেন ৩১ জন। এর বাইরে ৩০০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতির ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, কোনো শূন্য পদ ছাড়াই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই এসব পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে পদোন্নতি বোর্ড করে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিতে হয় এবং সিন্ডিকেটের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রার পদে অধ্যাপকদের থেকে কারও দায়িত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
রাজধানীর প্রায় ১০টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক এবং অধ্যক্ষ পদ ছিল স্বাচিপ ও আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের দখলে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পদত্যাগ করেছেন। বাকিরা নানাভাবে চেষ্টা করছেন পদ ধরে রাখতে। একই অবস্থা হাসপাতালের পরিচালকদেরও। তারা এখন দিনরাত তদবির করে যাচ্ছেন মন্ত্রণালয়ে। তবে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দিতে চায় না ড্যাব।
ড্যাব সদস্যদের দাবি, তারা বিগত ১৫ বছর নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছেন, যোগ্যতা থাকার পরও পদোন্নতি হয়নি, প্রশাসনের দায়িত্ব থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। তাদের এ দাবি সত্য, কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা যে অনিয়মে জড়ালেন, তা চিকিৎসা খাতের জন্য লজ্জাজনক বলে মনে করছেন অনেকেই। যারা বঞ্চিত ছিলেন তারা ধীরেসুস্থে নিয়ম মেনে তাদের প্রাপ্য বুঝে নিতে পারতেন বলে অভিমত জনস্বাস্থ্যবিদদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তররে সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব ধরনের অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এবারের আন্দোলন। সাধারণ চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের চাওয়া স্বাস্থ্য খাতে রাজনীতি বন্ধ করা। আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় সরকার স্বাচিপ ও ড্যাবকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিএমএকে অকার্যকর করে রেখেছে। এ দুটি সংগঠনকে (স্বাচিপ ও ড্যাব) আইন করে বন্ধ করা যায় কি না, এ সরকার তা ভাবতে পারে। যদি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতাল এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের দলীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া আইন করে বন্ধ করা যায়, তা উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে বিএমএকে কার্যকর করা যায়।’
নব্বইয়ের দশকে দেশে চিকিৎসকদের রাজনীতি শুরুর পরপরই দেখা দেয় বিভাজন। ১৯৯০ সালে বিএনপি-সমর্থিত ড্যাবের সৃষ্টি হয় অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর হাত ধরে। অন্যদিকে ১৯৯৫ সালে ডা. আ ফ ম রুহুল হকের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে স্বাচিপ। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর পর থেকে ড্যাব ও স্বাচিপের নিয়ন্ত্রণেই দেশের স্বাস্থ্য খাত। মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতাল, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের সব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদের চেয়ার দখলের লড়াইয়ে নামেন চিকিৎসক নেতারা। আর এতে বঞ্চিত হন রাজনীতিবিমুখ চিকিৎসকরা। রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকায় দক্ষ হলেও তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হন, সব ধরনের যোগ্যতা থাকার পরও মেলে না পদোন্নতি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে চিকিৎসা খাতের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্বাচিপ। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই স্বাচিপের নেতারা নিয়ন্ত্রণ নিতে অ্যাডহক ভিত্তিতে দলীয় চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। সারা দেশের চিকিৎসকদের পদোন্নতির জন্য স্বাচিপ কার্যালয়ে বসে তালিকা তৈরি করে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়ে অনুমোদন করানোর ঘটনা ঘটেছিল। ২০০৯ সালের ১০ জুলাই সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে ছয় হাজার চিকিৎসক পদ শূন্য রয়েছে জানিয়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগের ঘোষণা দেন। তার এ ঘোষণার পর সারা দেশে চিকিৎসকদের তালিকা তৈরি করে স্বাচিপ এবং তাদের তালিকা থেকেই নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। রাতারাতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিও দখলে নিয়েছিলেন স্বাচিপপন্থিরা।
২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মহাজোট সরকারের বিজয়ের আগপর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতের সব ক্ষেত্রে ছিল ড্যাবের একচ্ছত্র আধিপত্য। ড্যাবের নেতাকর্মীদের দাপটে তখন স্বাচিপ ছিল কোণঠাসা। স্বতন্ত্রদের (স্বাচিপ বা ড্যাব কোনো সংগঠনেই সম্পৃক্ত না থাকা) একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই আমলেও। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর রাতারাতি দখল হারায় ড্যাব। প্রশাসনের সর্বত্রই দাপট দেখাতে শুরু করে স্বাচিপ, তাদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়া ড্যাব গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত নীরব ছিল। স্বাচিপ ও ড্যাবের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা খাত ও চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা। তাদের গোষ্ঠীস্বার্থ স্বাস্থ্য খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
