বিদেশি ইন্ধনে অস্থিরতা 

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০৭ এএম

নানা ধরনের উদ্যোগ-আয়োজনের পরও পোশাকশিল্পের অস্থিরতা দূর হচ্ছে না। অস্থিতিশীলতা দূর করতে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা বৈঠক করেছেন। সেখানে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। সেখানে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কারখানা খুলে দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এখনো বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বেশ কিছু কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পোশাক শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভের জেরে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এবার পোশাক খাতের শ্রমিকরা হঠাৎ কিছু অপ্রচলিত ইস্যু সামনে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে শুধু নারী নয় সমান সংখ্যক পুরুষকর্মী নিয়োগ, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, হাজিরা বোনাস প্রদান এবং আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়াসহ ১১ দফা দাবি।

দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের এই সহিংস আন্দোলন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেখা যাচ্ছে, চলমান আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকের অংশগ্রহণ খুবই কম। অনেককে ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী শ্রমিকদের বেশিরভাগই বহিরাগত। আর্থিকভাবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র কি না, অনেকেই সেই সন্দেহ করছেন। এই সন্দেহের পেছনে কারণও রয়েছে। বাংলাদেশের আর্থিক অগ্রগতি অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষার বিষয়। শক্তিধর দেশগুলো সবসময় চায় আর্থিকভাবে বিকাশমান দেশগুলো যেন সারাক্ষণ বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে থাকে। আর্থিকভাবে পরনির্ভর থাকে। তাহলে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা হয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশে একটি নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ-প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এ সময় শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারলে পোশাক খাত সমস্যার সম্মুখীন হবে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে বায়াররা ভিন্ন কোনো দেশে তাদের ব্যবসা শুরু করবে। তাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই আকাক্সক্ষা থেকে কোনো বৈদেশিক শক্তির পক্ষ থেকে দেশের পোশাক খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে ধ্বংস করার জন্য যদি কোনো অদৃশ্য শক্তি সত্যিই পর্দার আড়ালে কলকাঠি নাড়ে, টাকা ছিটিয়ে দেশীয় এজেন্টদের দিয়ে শিল্পাঞ্চলগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালায়, তবে সেই অপশক্তিকে খুঁজে বের করা দরকার। মালিক, শ্রমিক, সরকার সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার প্রশ্ন যুক্ত। একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি শ্রমিক ও মালিক উভয়ের প্রতিষ্ঠান। দুপক্ষেরই রুজি-রোজগারের স্থান। শিল্প যাতে ধ্বংস না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার উভয়েরই। এ ব্যাপারে উদাসীনতা দেখানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশের এই খাত ধ্বংস হয়ে গেলে মালিক-শ্রমিকসহ সারা দেশের অর্থনীতি ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেকোনো মূল্যে এই খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় খাত গার্মেন্টস। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই খাত থেকে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ ভাগ আসে। বৈদেশিক মুদ্রাভা-ারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি অন্তত ৪৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করছে। নারীর ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে। পোশাক খাতের মোট শ্রমশক্তির ৫৫ শতাংশ নারী। গত দুই দশকে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর অর্থনীতির মূল ঝোঁক অনুৎপাদনশীল খাতের দিকে হলেও বাংলাদেশ পোশাকশিল্পের মতো উৎপাদনশীল খাত নিয়ে বিশ্ববাজারে দাপটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।

উল্লেখ্য, দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষিত হয়। গত বছর ন্যূনতম মজুরি পুনরায় নির্ধারণের সময়কালে হঠাৎ করেই শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয় গাজীপুর-আশুলিয়া এলাকায়। মজুরি নির্ধারণের পর থেমে যায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন। আন্দোলনের সময় গাড়ি পোড়ানো হয়, অনেক কারখানা ভাঙচুর করা হয়।

আগের মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়িয়ে নতুন মজুরি নির্ধারণ করে সরকার। আন্দোলনে কারখানা ভাঙচুর করা হলেও আন্দোলনকারী শ্রমিকদের পূর্ণ বেতন দিয়ে আবারও কাজে ফিরিয়ে নেয় কারখানা মালিকরা। আন্দোলন চলাকালে কিছু শ্রমিক নেতার ইন্ধনে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা কারখানাসহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায়। পরবর্তীকালে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এটাও তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার অন্যতম কারণ। তবে কারণ যাই হোক, এ ব্যাপারে যত দ্রুত সম্ভব সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

পোশাক খাত বিকশিত না হলে দেশ বেকারের ভাগাড়ে পরিণত হতো। শত বাধা বিপত্তি পার হয়েও আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিকাশমান গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করে যারা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়ার আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। পোশাকশিল্প খাত ধ্বংস হয়ে গেলে আমাদের জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। এ খাতের অস্থিরতা ও অরাজক পরিস্থিতি রপ্তানি আয়ে ধস অনিবার্য করে তুলবে। তৈরি পোশাকশিল্প খাত ধ্বংস হয়ে গেলে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের আয় কমে যাবে ৮০ ভাগ। বন্ধ হয়ে যাবে পরিবহন খাতে ৫৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে প্যাকেজিং ও প্রিন্টিং শিল্পে তৈরি পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক ৫০০ কোটি টাকার কাজ। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের মুনাফা হ্রাস পাবে ৮০ ভাগ।

দেশ-বিদেশের যারা এই সেক্টরকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে চায়, তাদের চিহ্নিত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে শ্রমিকদের সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে। মালিক পক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে শ্রমিকদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। শ্রমিকদের শোষণ করে একচেটিয়া মুনাফা করার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

দেশের সব রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। কেউ যেন নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের মতো কাজ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিটি কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, সেনাবাহিনী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আলাদা করে আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধান করা দরকার। পাশাপাশি শিল্প পুলিশকে কার্যকর করতে হবে। এটা ঠিক যে, এখনো শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি, নিরাপত্তা, পৃথক গার্মেন্টস ভিলেজ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। এ যাবৎ শুধু ক্রেতাদের চাহিদা মাফিক পোশাক তৈরি করেছে আমাদের পোশাকশিল্প। কখনোই স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ গুরুত্ব পায়নি। কেবল এ শিল্প খাতের উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং গোটা অর্থনীতির স্বার্থেই এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

পোশাক কারখানা চালু থাকা মানে, অসংখ্য শ্রমিকের জীবনমানের ভিত শক্ত থাকা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছোটখাটো অনেক উৎপাদনশীল খাত। পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকরা বাঁচিয়ে রেখেছেন দেশি প্রসাধন কোম্পানি থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, স্যান্ডেল-জুতা উৎপাদনকারী বহু প্রতিষ্ঠান। এসবের বড় অংশের ক্রেতা পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকরা। তাদের আয়ের উৎস সচল থাকা মানে এসব কিছু সচল থাকা। তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোয় সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ নিয়ে যেকোনো বিদেশি ষড়যন্ত্র, আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে মোকাবিলা করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত