প্রতিপক্ষ ঠেকাতে গিয়ে নিজেরাই এখন প্রতিপক্ষ

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০৪ এএম

রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের মূল দায়িত্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালতকে সহযোগিতা করা। সে লক্ষ্য থেকে তাদের প্রায়ই বিচ্যুত হতে দেখা গেছে গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে। আইনকর্তাদের বড় একটা অংশ ব্যস্ত ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ভিন্নমতাদর্শীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে, বিষোদ্গারে, মামলা দায়ের ও নির্বাচন নিয়ে।

প্রতিপক্ষকে সামাল দিতে গিয়ে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের বা মতাদর্শের আইনজীবীরা জড়িয়েছেন বিবাদ, কোন্দল ও মারামারিতে। যারা দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট ও আন্তরিক ছিলেন, তারাও ছিলেন চাপে।

বাস্তবতা হলো, প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে বা মোকাবিলা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের আইন কর্মকর্তারা এখন নিজেরাই হয়ে উঠেছেন প্রতিপক্ষের লক্ষ্য। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকার প্রায় দেড়শ ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালতে উল্লিখিত আইন কর্তাদের দেখা মিলছে না। ফলে বিচারকাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিচারাকাক্সক্ষীরা ও তাদের আইনজীবীরা পড়ছেন ভোগান্তিতে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এর কয়েক দিন আগে থেকেই ঢাকার আদালতপাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কয়েকশ আইনজীবী আসছিলেন না। তাদের অনেকেই চলে গেছেন আত্মগোপনে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা পরিস্থিতি নিরিখ করে বলছেন, গত তিন দশকে লাখ লাখ মামলা হয়েছে, এসবের ভারে আদালতগুলো ন্যুব্জ। বিচার নিয়ে হতাশায় ভুগছেন বিচারপ্রার্থীরা।

অন্যদিকে, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেছে, দলীয় বিবেচনায় আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া একটা রেওয়াজে পরিণত করেছে তারা। রাজনীতিকরণের ফলে অযোগ্য লোকরাও নিয়োগ পেয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে মামলায় ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে যাদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখার কথা, সেই আইন কর্মকর্তাদের ভূমিকা সংগত কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেন, গত কয়েক বছরে আদালতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যকার বিরোধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতি আগের সব ঘটনা ছাড়িয়ে গেছে। এর কারণ শুধুই রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব, যা খুব নেতিবাচক।

আদালত আছে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নেই : ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকার আদালতে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার), বিশেষ পিপি, অতিরিক্ত পিপি, অতিরিক্ত জিপি, সহকারী পিপি পদে ৬৫০ জনের বেশি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকার আদালতের নিয়মিত আইনজীবীরা বলেন, বিতর্ক তৈরি হয়েছে গত এক দশকে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগপর্যন্ত নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক বেশি। আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সক্রিয় নেতারাও নিয়োগ পেয়েছেন আইন কর্মকর্তা হিসেবে। যদিও গত এক দশকে ঢাকার আদালতে অর্ধেকের বেশি আইন কর্মকর্তা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের ভাষ্য, মাঠের রাজনীতি আদালতে গড়িয়েছে। আইনজীবীদের অনেকেই উৎসাহী হয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন। এখন পরিস্থিতির বদল ঘটায় অপ্রীতিকর ঘটনার শঙ্কায় ওই আইনজীবীরা আদালতে আসছেন না।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও সাবেক সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের জামিন ও রিমান্ড শুনানিতেও আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা আসছেন না। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো আইন কর্মকর্তার পদত্যাগের খবর শোনা যায়নি।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আবু। তিনি ১৫ বছরের বেশি সময় এ পদে ছিলেন। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে তিনি আদালতে আসছেন না। তার মোবাইল ফোন বন্ধ। সম্প্রতি অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজীকে ঢাকার মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি নিয়োগ দেওয়ার পর বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একাংশ তুমুল বিরোধিতা করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এহসানুল হক সমাজী পিপি পদে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে সলিসিটর বিভাগকে চিঠি দেন। পরে তার নিয়োগ বাতিল হয়।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আইন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। আইন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন জমা পড়েছে। নতুন আইন কর্মকর্তা নিযুক্ত হলে আদালতের কার্যক্রমে গতি আসবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা। অতিরিক্ত পিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল হক বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন কর্মকর্তাদের অনেকেই আদালতে আসছেন না। আমরা শুধু শুনানির তারিখ নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘শুনেছি নতুন নিয়োগ হবে। সরকার চাইলে দায়িত্ব পালন করব। নতুন করে নিয়োগ না পেলে দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাব।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম নিয়মিত ঢাকার আদালতে মামলা পরিচালনা করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশেষ আদালতের কিছু মামলায় শুনানি হলেও বেশিরভাগ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো আইনজীবী আসছেন না। নতুন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হচ্ছে না। বিচারপ্রার্থীদের শুধু তারিখ দেওয়া হচ্ছে। তারা হতাশ। এভাবে কতদিন চলবে কে জানে?’

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির দুদিন আগে ঢাকার আদালতপাড়ার পরিস্থিতি ছিল ভীতিকর। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা মারমুখী ছিল ওই সময়ে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে ভাঙচুর হয়। ঢাকা বারে ২০২৪-২৫ মেয়াদের নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা ২৩টি পদের ২১টিতে জয়লাভ করেছিলেন। নির্বাচনে দুপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। গত ৫ আগস্টের পর সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় কেউ না আসায় ১৪ আগস্ট কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে সমিতির আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু করেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। যদিও এ আহ্বায়ক কমিটিকে অবৈধ আখ্যায়িত করেন আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা।

নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে অতিরিক্ত পিপি পদমর্যাদার একজন আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে আদালতে নিয়মিত যাচ্ছি না। যে কয়েক দিন গিয়েছি অপদস্থ হতে হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় আছি।’ তিনি বলেন, ‘অতি দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোক নিয়োগের রেশ আমাদের টানতে হচ্ছে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের ‘পার্ট অব জুডিশিয়ারি’ আখ্যায়িত করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা বিচার বিভাগের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এখন পর্যন্ত শক্তিশালী প্রসিকিউশন গড়ে ওঠেনি। বিচারপ্রার্থীদের ভরসা তাদের ওপর নেই। এর কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য লোককে নিয়োগ দেওয়া। এর প্রতিফলন আমরা গত কয়েক বছরে দেখেছি।’ তিনি বলেন, ‘আইনজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। আইন কর্মকর্তা হিসেবে সেটি দেখাতে গেলে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হন, বিচার বিভাগের প্রতি তাদের আস্থার সংকট তৈরি হয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত