ইসলাম গোটা মুসলিম জাতির মধ্যে ভাষা, বর্ণ ও রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ধর্মীয় ঐক্যের ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ ধর্মীয় চেতনায় এক ও অভিন্ন হোক। ইমাম রাগেব ইস্পাহানি (রহ.) ‘মুফরদাতুল কোরআন’ গ্রন্থে লিখেছেন, উম্মাহ বলা হয় এমন মানবগোষ্ঠীকে, যাদের মধ্যে কোনো বিশেষ কারণে সংযোগ ও ঐক্য বিদ্যমান থাকে। আর অধিকাংশ তাফসিরবিদ একমত যে, তা হলো ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় এটার বাস্তব প্রতিফলন ঘটান। যেখানে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোসায় পরিপূর্ণ ছিল। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা আর কাজ-কর্মে একতার ফলে মুসলিম জাতির মধ্যে সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করত। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন, ‘মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ইমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদের ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে সেটার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা হাশর ৯)
মুসলিম-অমুসলিম সবাই আদম সন্তান। তাই ইসলাম ধর্ম মানুষের অধিকার নিশ্চিতে গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা সনদে স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে জাতীয় স্বার্থের ব্যত্যয় ঘটতে পারে না। জনসাধারণের ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় জাতীয় স্বার্থ। যেখানে মানুষের জানমাল নিরাপদ এবং অপরাধ নিষিদ্ধ। একতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সাহাবিদের ভ্রাতৃত্ববোধ এত প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল যে, একজন অন্য ভাইয়ের জন্য নিজ ধন-সম্পদ ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করত না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩)
মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের উৎস একত্ববাদের বিশ্বাস। ইবাদতের ঐক্যস্বরূপ সমগ্র দুনিয়ার মুসলমান আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে। পবিত্র হজের মৌসুমে মক্কায় হজ পালন করে। সব মুসলমান একই কোরআন ও হাদিস পাঠ করে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রেখে যাওয়া আদর্শের অনুসারী সবাই। তবে আজ মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ফাটল কেন? আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আজাব।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৫)
ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা একটি দেহের মতো। আর মুসলমানদের গৌণ বিষয়ে মতানৈক্য হলো দেহের বিষফোড়া, যা যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহের ঐক্যে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো ব্যাপারে আপনার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদের সে বিষয়ে অবগত করবেন।’ (সুরা আনআম ১৫৯) মুসলিম উম্মাহের মধ্যে অল্পকিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও মহান আল্লাহর একত্ববাদ, রাসুল (সা.)-এর অনুসরণ, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, জান্নাত, জাহান্নামসহ মৌলিক বিষয়ে সবাই একমত। তাই কোরআন ও হাদিসের সিদ্ধান্ত ব্যতীত মতানৈক্য এবং বিতর্কিত বিষয়ে ধর্মীয় প-িত ও নেতাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত নয়, এই বোধে সবাই বিশ্বাসী হলে মুসলমানদের ঐক্য মজবুত হবে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনফাল ৪৬) মুসলমানদের ওপর বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রের কারণে আজ এত অনৈক্য। এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতে মুসলিম উম্মাহের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
মুসলিম উম্মাহের প-িতদের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞান ও দার্শনিক জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে দীর্ঘস্থায়ীভাবে ঐক্য করতে পারছে না। দীর্ঘস্থায়ীভাবে ঐক্যের জন্য ধর্মীয় প-িতদের দৃঢ় সংকল্প থাকা প্রয়োজন। মুসলিম উম্মাহের চতুর্দিকের গভীর ষড়যন্ত্রের জাল ধ্বংস করতে পারস্পরিক উদারতা ও পরমতসহিষ্ণু হওয়া প্রয়োজন। ভিন্ন দল হোক, ভিন্ন পথ হোক কিন্তু ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থ সর্বপ্রথম বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ অবিচার, দুর্নীতি ও নির্যাতনে মানুষ নিষ্পেষিত। আজ মুসলিম উম্মাহের আকাশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। আর মুসলিম উম্মাহ ভুলে গেছে বিদায় হজের ভাষণ। কোরআন ও হাদিস থেকে বিচ্যুতি গভীরতম ক্ষতের সৃষ্টি করেছে উম্মাহের ঐক্যে।
তাই মানবতা আজ ভূলুণ্ঠিত। আইন আদালত নির্বাসনে। মহাদুর্যোগে মুসলিম উম্মাহ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ঐক্যের ডাক দেওয়া ছাড়া রক্ষার আর কোনো পথ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের জন্য রয়েছে সামনে ও পেছনে, একের পর এক আগমনকারী প্রহরী, যারা আল্লাহর নির্দেশে তাকে হেফাজত করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো কওমের অবস্থা ততক্ষণ
পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ ১১)
