রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিভিন্ন খাতে যে ছয়টি কমিশন গঠন করেছে, সেগুলো তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পারবে বলে আশা করছে সরকার। প্রতিবেদন পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক মতৈক্য গড়ে সংস্কার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার, সুনির্দিষ্ট কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনী এনে তারপর নির্বাচনের কথা ভাবছে সরকার।
গতকাল বৃহস্পতিবার অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদেও বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে।
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলা ওই বৈঠকে অন্তর্র্বর্তী সরকারের গত এক মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় নিয়েও আলোচনা করেন উপদেষ্টারা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক এরশাদ সরকারের সময়ও এরকম কিছু সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল উল্লেখ করে তা বাস্তবায়ন করে যেতে না পারার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে এবারের সংস্কারকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়েও জানতে চান।
জবাবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, এরশাদ সরকারের সঙ্গে এ সরকারের বড় পার্থক্য রয়েছে। এ সরকার একটি গণঅভ্যুত্থানের ফসল। এই গণঅভ্যুত্থানে দুটি শব্দ ছিল। একটি হলো বৈষম্যবিরোধী, আরেকটি হচ্ছে সংস্কার। এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে একটি প্রকৃত গণতন্ত্রের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়া। যেহেতু এরশাদ সরকারের সঙ্গে এই সরকারের মৌলিক পার্থক্য আছে, তাই সেই সরকারের কর্মপদ্ধতি, কর্মপরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যকে কোনোভাবেই মেলানো যাবে না।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, এই যে কমিশনগুলো হলো, প্রাথমিকভাবে আমরা আশা করছি, তিন মাসের মধ্যে তারা প্রতিবেদন দিতে পারবে। এগুলো আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, সেটা নির্ভর করবে এর সপক্ষে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারি কি না। এজন্য সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোরও মতামত চাচ্ছি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নিশ্চয়ই এত দিনে উপলব্ধি হয়েছে যে, এরশাদ সরকার করে যেতে পারেনি, তার ফল কী হয়েছে, এটি রাজনৈতিক দলগুলো দেখেছে। তারাও কোনো সংস্কার করেনি। এর ফল কী হয়েছে, এটাও ৫ আগস্ট গোটা জাতি দেখেছে। কোনো রাজনৈতিক দল নিশ্চয়ই অজনপ্রিয় হয়ে আবার একইরকম ফল দেখতে চাইবে না।
তিনি বলেন, কমিশনের প্রধানরা সবাই অভিজ্ঞ। তাদের হাতে নিজস্ব যে গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত আছে, তা নিয়ে আপাতত কাজ শুরু করবে। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ অধিবেশন শেষ করে দেশে ফিরলেই বাকি সব কর্মপরিধি চূড়ান্ত করা হবে।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ব্যাংকগুলোতে কিছু অর্থ ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) করে রাখে। যেটার আয় দিয়ে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করে। জলবায়ু ট্রাস্টের নামে একটা তহবিলে সরকার ৩ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা দিয়েছে। তার মধ্যে কিছু টাকা বিগত সরকার জমা রেখেছিল ফারমার্স ব্যাংকে, যেটা পরবর্তীকালে পদ্মা ব্যাংক হয়। সুদে-আসলে বেড়ে ব্যাংকের কাছে ৮৭৩ কোটি ৮১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পাওনা হয়েছে। এ টাকাটা বারবার চাওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক দিচ্ছে না।
সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ ছাড়াই নিজেরা বছর বছর এই এফডিআর নবায়ন করছে উল্লেখ করে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন তাদের (ব্যাংকের) বক্তব্য হচ্ছে ২০৩৮ সালের আগে এ টাকা তারা দিতে পারবে না। না সুদ, না আসল। এরকম সমস্যা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং যেসব মন্ত্রণালয় এবং সরকারি সংস্থা এ ধরনের সমস্যায় পড়েছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করবে। সেখানে ওইসব ব্যাংক থাকবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক একটা রোডম্যাপ তৈরি করবে। যাতে জনগণের এ অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাত যে কতটা ভঙ্গুর হয়েছে এটা তার সামান্য একটা নমুনা। এটা নিয়ে খুব দ্রুত বৈঠক হবে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থাটাও বিবেচনা করা হবে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মতো শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে ১১৪ কোটি টাকার এ ধরনের এফডিআরের একটা হিসেব পাওয়া গেছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, অন্যান্য দপ্তরের অর্থ যোগ করলে টাকার পরিমাণ আরও বাড়বে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা বলেন, ‘পাশের দেশসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চাই আমরা। কিন্তু সেটা হবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো চাই আজকেই এটা স্বাভাবিক হোক। কিন্তু সেটা করতে পারছি না কারণ, আমাদের অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হচ্ছে। তাছাড়া পুলিশের যে মনোবল ভেঙে গিয়েছিল, সেটাও অনেকখানি স্বাভাবিক হচ্ছে। আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে।’
৭ সদস্যের জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন : উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে সাত সদস্যের ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়েছে। এতে শহীদ মুগ্ধর বড় ভাই মীর মাহবুবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক এবং কাজী ওয়াকার আহমেদ কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। উপদেষ্টাদের মধ্যে মো. নাহিদ ইসলাম দপ্তর সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে আছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নূর জাহান বেগম ও শারমিন এস মুরশিদ।
ওই স্ট্যান্ডিং কমিটির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আরও ১৪ জন যুক্ত করে ২১ সদস্যের একটি কমিটি এই ফাউন্ডেশনে কাজ করবে বলে জানান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।
তিনি বলেন, এ ফাউন্ডেশন থেকে শহীদ পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে তাদের ভবিষ্যতে নানারকম সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
দ্রুত শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে আসবে : উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘শ্রমিকদের অসন্তোষ নিয়ে প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উপদেষ্টারা বসছি। বুধবারও আমরা বসেছিলাম, সেখানে ছয়জন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বসে থাকা অবস্থায় একটি বড় কোম্পানি বেতন দিতে না পারার কারণে তার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলে ৮৪ কোটি টাকা ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। এতে সেই বেল্টের ৩০ হাজার শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। আজ (বৃহস্পতিবার) সেজন্য শ্রমিক অসন্তোষ কম আছে।’
তিনি বলেন, ‘এরপরও আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখছি। যেসব সমস্যা আছে সেগুলো সমাধানের জন্য একটি পর্যালোচনা কমিটি শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে করে দেওয়া হয়েছে। এ কমিটি শ্রম ভবনে বসবে। শ্রমিক ভাইদের আহ্বান জানাব, যেকোনো অভিযোগ যেগুলো নিষ্পত্তিযোগ্য তারা শ্রম আইনের মধ্যে সমাধান করতে পারবেন সেগুলো সেখানে দেওয়ার জন্য বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো শ্রমিক তার কারখানায় হামলা করছে না। বহিরাগত ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করছে বলে খবর পেয়েছি আমরা। এই আনরেস্টের কারণে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অর্ডার বাতিল হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের ক্রেতারা এ অর্ডার অন্য দেশে নেওয়ার চেষ্টা করছে।’
