২০০ ছাড়াল বন্ধ কারখানা রপ্তানিতে আঘাতের শঙ্কা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:০০ এএম

শ্রমিক অসন্তোষ টানা ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে। প্রতিদিনই গাজীপুর, ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, জিরানী অঞ্চলের বেশিরভাগ কারখানায় নানা দাবিতে চলছে শ্রমিক বিক্ষোভ। কারখানা বন্ধের সংখ্যা বেড়েছে। বিক্ষোভ-আন্দোলনের জেরে গতকাল বৃহস্পতিবারও আশুলিয়ায় বন্ধ ছিল ২১৯ কারখানা।

‘নো ওয়ার্ক নো পে’ অর্থাৎ কাজ নেই তো মজুরিও নেই ধারায় কারখানা বন্ধ করে দিয়েও মিলছে না প্রতিকার। এর কারণে এদিকে উৎপাদন কমে যেমন ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তেমনি বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পোশাক খাতের শ্রমিকদের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরানোর।

দেশের শিল্প খাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে যখন এ অস্থিরতা চলছে, তখন দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক কারখানায় অস্থিরতার কারণে ক্রেতারা পাশের দেশ ভারতের দিকে ঝুঁকতে পারে। ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় আছে। ইকোনমিস্ট জানিয়েছে, টানা অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশে এ বছর রপ্তানি আয় কমতে পারে ১০ থেকে ২০ শতাংশ।

গতকাল প্রকাশিত ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদক হওয়ার পরও ভারত পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে। ভারত ২০২৩ সালে তাদের তুলা রপ্তানির এক-চতুর্থাংশ বাংলাদেশেই রপ্তানি করেছে। সম্প্রতি ভারতের দক্ষিণের টেক্সটাইল হাব তিরুপুরে অবস্থিত রপ্তানিকারকদের একটি দল বলেছে, বাংলাদেশে অস্থিরতার কারণে তারা ৫৪ মিলিয়ন ডলারের নতুন ক্রয়াদেশ পেয়েছে। দিল্লির বাইরের আরেকটি গ্রুপ বলেছে, তারা স্প্যানিশ ফ্যাশন ফার্ম জারা থেকে আগস্টে ১৫ শতাংশ বেশি ক্রয়াদেশ পেয়েছে।

অবশ্য বাংলাদেশের অস্থিরতার কারণে ভারতে ক্রয়াদেশ চলে যাওয়াটা কঠিন হবে বলে মনে করছেন শিল্প খাত বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব। দ্য ইকোনমিস্টকে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতের বর্তমান অস্থিরতা স্বল্পমেয়াদি, কারখানাগুলো ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতিও হয়েছে।

বাংলাদেশের পোশাকের বাজার ভারতের নিজেদের দখলে নেওয়া যে সহজ হবে না, তাও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক খাত তার প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করছে। বিশেষ করে শ্রম খরচ অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় এখানে এখনো অনেক সস্তা। তাছাড়া ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ যে অগ্রাধিকার পায়, ভারত সেখানে সে সুবিধা পায় না। এ ছাড়া বড় বড় ক্রয়াদেশ সহজেই বুঝিয়ে দেওয়ার যে বিশাল অভিজ্ঞতা, সেটা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলোর নেই।

ওই প্রতিবেদন বলছে, পোশাক শ্রমিকসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছে নতুন দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে দেশও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ বছর গ্যাসের ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো কম ক্ষমতায় চলতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারণে ধারণা করা হচ্ছে, সামগ্রিক পোশাক রপ্তানি এই বছর ১০-২০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

তবে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাষ্য, পরিস্থিতি খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে আসছে। কিছু ক্রেতা সাময়িকভাবে চলে গেলেও বড় ক্রেতারা এখনো আস্থা রাখছেন। বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যেহেতু এখনো রপ্তানির তথ্য পাইনি, তাই সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না কত কমেছে। তবে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ সম্পর্কে ক্রেতারা এখনো অবজার্ভ করছে। বড় বড় ব্র্যান্ড সবাই এখনো আমাদের সঙ্গেই আছেন। তারা জানেন, অবস্থা যা ছিল তার সমাধান হয়েছে। এত বড় পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলার ঘাটতি থাকবেই, এটি কেউ অস্বীকার করতে পারব না। সরকার যেভাবে আমাদের সহযোগিতা করছে, শিগগিরই আমরা সব মোকাবিলা করে পুষিয়ে উঠতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘কিছু ক্রেতা আছে তারা অন্য জায়গায় গিয়ে দেখছে, তারা ভাবছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভালো না হলে সেখানে তারা প্লেস করবে। কিছু ব্যতিক্রম তো আছেই। আবার বাইরের কিছু দেশ বাংলাদেশের এমন পরিস্থিতি নিয়ে গুজবও ছড়াচ্ছে।’

ভারতের সুযোগ কতটা বাস্তবসম্মত?

ইকোনমিস্ট বলছে, এ পর্যায়ে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্য ভারতের নেই। দেশটির ইন্ডাস্ট্রির এক অভ্যন্তরীণ সূত্রই এমন তথ্য দিয়েছে। ওই সূত্র ইকোনমিস্টকে বলছে, শ্রমনিবিড় পোশাক খাতের পরিবর্তে ইলেকট্রনিকসের মতো বিনিয়োগনির্ভর খাতকে বাড়ানোর দিকে খুব বেশি নীতি ও মনোযোগ দেওয়া হয়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতীয় পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৫ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের ৬৩ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ভারতের সুরক্ষাবাদী নীতিকে দায়ী করা হয়েছে। টেক্সটাইল এবং পোশাকের গড় আমদানি শুল্ক ২০১৭ সাল থেকে ১৩ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ভারতের পোশাক উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে।

ভারতের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ আসতে পারে চীনে কমমূল্যের পোশাক উৎপাদনের পতন থেকে। তবে এখানেও ভারতকে লড়াই করতে হবে বাংলাদেশের সঙ্গেই। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, চীন সম্প্রতি স্বল্প দক্ষতার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এ থেকে সবচেয়ে বেশি দুটি সুবিধাভোগী দেশ বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম।

গতকালও বন্ধ ছিল ২১৯ কারখানা

গত কয়েক দিন অভ্যন্তরীণ দাবিদাওয়া নিয়ে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের জেরে মালিকপক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় গতকালও আশুলিয়ায় ২১৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ৮৬টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। এ ছাড়া বাকি ১৩৩টি কারখানায় দেওয়া হয়েছে সাধারণ ছুটি। শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য কারখানাসহ ঢাকা ইপিজেডের কারখানাগুলো চালু রয়েছে।

অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যা হলো ভার্চুয়াল বটয়ম, ম-ল নিটওয়্যারস লিমিটেড, সিগমা ফ্যাশনস লিমিটেড, হা-মীম গ্রুপ, ক্রশওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জিন্স প্রডিউসার লিমিটেড, অরুণিমা গ্রুপের অরুণিমা স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড এবং ডিএমসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, এসএম নিটওয়্যারস লিমিটেড, আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড, মানতা অ্যাপারেলস লিমিটেড।

শ্রমিকরা জানায়, টানা ১০ দিনের বেশি সময় ধরে কারখানার ভেতরে ও সড়কে শ্রমিকরা দাবি আদায়ের জন্য বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি পালন করছে। কিন্তু মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি নিয়ে টালবাহানা করছে। কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েও পরে দাবি মেনে নেয়নি। এতে শ্রমিকদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া যেসব কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ কারখানায় গত মাসের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেনি।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক টেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, মালিক-শ্রমিকের আলোচনার কোনো পথ তৈরি হচ্ছে না। অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটির কারণে শ্রমিকরা বাসায় অবস্থান করছে আর মালিকপক্ষ অফিসে। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম জানান, গতকাল শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোনো সড়ক অবরোধসহ হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তবে আগে থেকেই কয়েকটি কারখানায় অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল। সেসব কারখানার শ্রমিক কাজে ফেরেনি। এ ছাড়া সকালেও বেশ কিছু কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশের পর কর্মবিরতিসহ কারখানা থেকে বের হয়ে যায়।

শান্ত হচ্ছে গাজীপুরের শিল্প এলাকা

গাজীপুরে দু-একটি পোশাক কারখানায় বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া জেলা জুড়ে পোশাক কারখানাগুলোতে অস্থিরতা কমে এসেছে। উৎপাদনে ফিরেছে কারখানাগুলো। গতকাল সকাল থেকে পোশাক শ্রমিকরা কারখানাগুলোতে কাজে যোগ দেয়। কারখানার নিরাপত্তায় থানা ও শিল্প পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শিল্প এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল দিয়ে যাচ্ছে। তবে বুধবার যে ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, তার মধ্যে কয়েকটি কারখানা খুলেছে আবার নতুন করে কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল ২৫টির মতো পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। আর ৫টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে।

জানা গেছে, গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরের সারাবো এলাকায় অবস্থিত বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শ্রমিকদের বিক্ষোভ গত দুদিনের তুলনায় গতকাল ছিল অনেকটাই কম। প্রায় ৪৫ হাজার শ্রমিক বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে কাজ করে। বুধবার রাত পর্যন্ত ৮০ ভাগ শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করা হয়। শুধু টেক্সটাইল ইউনিটের শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয়নি। গতকাল তারা বেতন পরিশোধের দাবিতে কারখানার সামনে বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে তারা কাশিমপুর আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে রাখে।

টঙ্গীতে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির শ্রমিকরা তাদের বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতি করে কারখানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের (জোন-২) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, গাজীপুরের শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও টঙ্গী এলাকায় পোশাক কারখানার সার্বিক পরিস্থিতি ছিল প্রায় স্বাভাবিক।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সাভার ও গাজীপুর প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত