মাকে বলেছিলাম, গ্রেপ্তারের চেয়েও বেশি কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকিয়েন

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৫৫ পিএম

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে পতন ঘটেছে আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলের। সরকার পতনের এই আন্দোলন শুরুতে ছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এই আন্দোলন শুরু হয়। সামনের সারিতে থেকে যার নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ক্রমশই সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় সমন্বয়ক পরিষদ। 

কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে মিল রেখে প্রত্যেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। যতই আন্দোলন কঠোর হতে থাকে ততই সমন্বয়দের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। জুলাই শেষ সপ্তাহ থেকে গত ৫ আগস্ট আগ পর্যন্ত সারাদেশের প্রধান সমন্বয়কদের পাশাপাশি যারা সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার শুরু হয়।

ব্যতিক্রম হয়নি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক মোখলেছুর রহমান সুইটের ক্ষেত্রেও। আন্দোলন চলাকালে ইবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জয় তাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয়। তবুও আন্দোলন থামাননি তিনি বরং আন্দোলনের মাত্রা বাড়ে।

আন্দোলনের শেষ সময়ে কীভাবে সবকিছু সামলিয়েছেন তা জানতে চাইলে তিবি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুরুর দিকে আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে আন্দোলন শুরু করি। প্রথমদিন আন্দোলনের পরেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হলে হলে আন্দোলনে না যেতে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেয়। আমরা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কর্মসূচি দিতাম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি না থাকলেও আমরা আন্দোলন করেছি। আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নেতা, ছাত্রলীগের হুমকি আর গোয়েন্দা বাহিনীর চাপ ছিল অনেক। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের আগ পর্যন্ত হলেই ছিলাম। হঠাৎ সরকারি সিদ্ধান্তে হল বন্ধের ঘোষণায় আমরা বিপাকে পড়ি। 

হল বন্ধ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা ভয়ে বাড়ি যেতে শুরু করে। আবার অনেকে ক্যাম্পাস পাশ্ববর্তী মেসগুলোতে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করে। কারফিউ চলাকালেও আমরা খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে আন্দোলন করেছি। কেন্দ্রীয় সমন্বয়দের কয়েকজনকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার পর আমার ওপর গোয়েন্দা বাহিনী সদস্যরা চাপ দিতে শুরু করে। আমি একদিনেই তিন থেকে চারটি বাসা পরিবর্তন করতাম। আমার মোবাইল ফোনটি বন্ধ রাখতাম। দিনে দুই থেকে তিনটি সিম পরিবর্তন করতাম। এভাবে গ্রেপ্তার আতঙ্ক নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন চলমান ছিল। 

জুলাই পেরিয়ে ১ আগস্ট থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা নানাভাবে আামকে খুঁজতে থাকে। আমার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও পুলিশ পাঠানো হয়। আমার মাকে বলা হয়, আপনার ছেলেকে আন্দোলন থেকে সরে যেতে বলেন, নয়তো গ্রেপ্তার ছাড়াও অন্যকিছুও হতে পারে। এই কথা শোনার পর আমার মা ফোন দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বাবা তুই বাড়িতে ফিরে আয়। তখন আমার কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। আমি ফোনে বলি, মা গ্রেপ্তার কিংবা এর চেয়েও বেশি কিছুর জন্য প্রস্ততু থাকিয়েন।' এই শুনে মা আরও কাঁদতে থাকেন, তখন আমি ফোন কেটে দেই। 

এরপর যতদিন কথা হয়েছে মা শুধুই বলে বাবা তোর কিছু হলে আমি কীভাবে বেঁচে থাকবো। তোর বাবা বেঁচে নেই তুই আমার সব। এসব শুনে নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি কিন্তু অনেকে তো নিজের জীবন দিয়ে আন্দোলন তীব্রতর করে যাচ্ছেন। এই থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আবার নিজের মনোবল দৃঢ় করেছি।'

মোখলেছুর রহমান সুইট আরও বলেন, সত্যি বলতে আন্দোলন চলাকালে মৃত্যু, গ্রেপ্তার আতঙ্ক কিছুই মনে হয়নি। এখন আন্দোলনের দিনগুলো মনে হলে গা শিউরে ওঠে৷ কারফিউ চলাকালে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশের বাঁধা উপেক্ষা করে ইবি শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। শিক্ষার্থীরা নানা হয়রানির পরেও আন্দোলন থেকে সরে যায়নি। বরং যতই দিন গেছে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এছাড়াও স্থানীয় মুক্তিকামী জনতাও আন্দোলনে অংশ নেন। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছে। তাই সবার কথা চিন্তা করেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ করবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর স্ট্যাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও সমন্বয়  সুইটের কাছে কেমন ক্যাম্পাস চান জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আমরা মূলত শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ন্যায্যতা চাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণামুখী হোক, সেশনজট গ্লানি মুছে শিক্ষকরা হবেন শিক্ষার্থীবান্ধব এটাই প্রত্যাশা। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দলীয়করণ মুক্তসহ নিরপেক্ষ হবে এই পদ্ধতি চালু হওয়া প্রয়োজন। এর জন্য আমাদের যা করনীয় আমরা শিক্ষার্থীরা তাই করবো।'

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত