এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করতে যাচ্ছেন। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাইডেনের সঙ্গে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ড. ইউনূসের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হচ্ছে না।
ঢাকা ও নিউ ইয়র্কের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো গতকাল শনিবার জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইউনূস-বাইডেন বৈঠকের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে ড. ইউনূস ২৩ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন।
এদিকে নিউ ইয়র্কে ড. ইউনূসের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক না হলেও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ উপলক্ষে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক কার্টেন রেইজার অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কোন কোন দেশের এবং কোন কোন সংস্থার প্রতিনিধির বৈঠক হবে, সে বিষয়টিও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের অবহিত করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আগামীকাল সোমবার নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন জানিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে বক্তব্য রাখবেন। পরে ওইদিনই তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। অধিবেশনে মুহাম্মদ ইউনূস বিগত দুই মাসে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থানের বিবরণ ও আগামী দিনে জনভিত্তিক, কল্যাণমুখী এবং জনস্বার্থে নিবেদিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় বিশ^দরবারে তুলে ধরবেন।
এ বছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘কারণ, এ বছর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ একটি উচ্চপর্যায়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানদের পাশাপাশি জাতিসংঘের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, কিছু সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান, বিভিন্ন সংস্থা প্রধান অংশগ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করছি।’
নিউ ইয়র্ক সফরকালে কাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাইড লাইনে বৈঠক হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কফ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেন, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেস, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং ইউএসএআইডির প্রশাসকের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু পাইপলাইনে আছে এবং এটি আমরা পরে জানাতে পারব।’
সেখানে কী কী বিষয়ে আলোচনা হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা হবে। আমাদের যেসব প্রতিশ্রুতি আছে, সেগুলো নিয়ে কথা হবে। এখানে যেসব সংস্কার হবে সেটি তাদের অবহিত করবেন। আমরা এরই মধ্যে মানবাধিকার নিয়ে যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, সেটিও জানাবেন। আমরা ইতিমধ্যে একটি মানবাধিকার কনভেনশনে পক্ষভুক্ত হয়েছি। আমরা দেশে যে খোলামেলা পরিবেশ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি বা করেছি, তাতে করে যে কেউ মানবাধিকার ইস্যু তুলতে পারেন এবং এ ব্যাপারে সরকার যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানে তৎপর থাকবে, সে ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন এবং দিয়ে থাকবেন। তবে কোনোটাই বেশি গভীরে যাবেন না। কারণ, এসব বৈঠক ১৫ থেকে ২০ মিনিটের হয়ে থাকে।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, প্রধান উপদেষ্টার পরিচিতি এবং সুনাম বিশ^ব্যাপী। এ কারণে অনেকগুলো বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এ ছাড়া, বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সভায় অংশগ্রহণ করার জন্যও অনুরোধ এসেছে। যেহেতু তিনি মাত্র তিন দিন নিউ ইয়র্কে অবস্থান করবেন, সেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সবার অনুরোধ রক্ষা করা বেশ কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘ অধিবেশনে আমরা রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টও আয়োজন করছি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারকাজ শুরু করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এবারের অধিবেশন নতুন বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘে বা বিশ্বসভায় নতুন পদচারণা। এবারের অধিবেশনে আমাদের কাছে একটি বিরাট সুযোগ বিশ্বদরবারে এই বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশকে উপস্থাপনের জন্য।’
বৈঠক হচ্ছে না ইউনূস-মোদির : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক হবে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই সময়ে নিউ ইয়র্কে যাচ্ছেন না। কারণ নরেন্দ্র মোদি আগে চলে আসবেন। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা দেরিতে যাচ্ছেন। কাজেই তাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে।’
‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য ভারত ভালোভাবে নেয়নি এবং সেজন্য প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হচ্ছে না’ গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ ধরনের প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘অনেক কথা আমাদের পছন্দ নাও হতে পারে। কাজেই আমার কথা ওনার পছন্দ হলো না বা ওনার কথা আমার পছন্দ হলো না এটি নিয়ে বেশি বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিষয়টি এমন নয় যে, এজন্য বাংলাদেশ ভারত থেকে বহু দূরে যাবে। আবার ভারতও অন্য কোথাও চলে যাবে এবং প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে না। প্রতিবেশী যেহেতু পরিবর্তন হয় না, কাজেই কথা পছন্দ হোক বা না হোক... ভারত থেকেও বিভিন্ন সময়ে অগ্রহণযোগ্য কথাবার্তা হয়েছে। এজন্য আমার মনে হয়, এ বিষয়টিতে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। শুধু এ কারণে তিনি (মোদি) দেখা করবেন না বা দেখা হচ্ছে না আমার সেটি মনে হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জয়শংকরের সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে যে এক ধরনের টানাপড়েন চলছে, এটা স্বীকার করতে হবে। সমস্যার সমাধান করতে হলে, সমস্যার অস্তিত্ব অস্বীকার করলে চলবে না। আমরা অবশ্যই টানাপড়েন পেছনে ফেলতে চেষ্টা করব এবং ওয়ার্কিং রিলেশন যেন হয়। তবে সম্পর্কটা হতে হবে সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে। এর ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং আমরা সেই চেষ্টা করব।’
৫৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল : জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এবার প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ৫৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগদান করবে। রাজনৈতিক সরকারের আমলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বড় প্রতিনিধিদল যেত, এবার এত ছোট কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে বড় প্রতিনিধিদল কেন যেত, সেটি আমি বলতে পারব না। আমি জানি না। কিন্তু বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্যয়সংকোচন করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় খরচ করা যাবে না।’
এবার নিরাপত্তা, গণমাধ্যমসহ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ৫৭ জন থাকছেন বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
এর আগে ৭৩তম ও ৭৪তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে যথাক্রমে ৩৪৪ ও ৩৩৫ জন গিয়েছিলেন। করোনা মহামারীর কারণে ৭৫তম অধিবেশন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর করোনা পরিস্থিতিতে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ৭৬তম অধিবেশনে ১০৮ জন, ৭৭তম অধিবেশনে ১৩৮ এবং ৭৮তম অধিবেশনে গিয়েছিলেন ১৪৬ জন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইস্ট এশিয়া প্যাসিফিক অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক হাসান।
