এই মুহূর্তে ছাত্রদলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কি ছাত্রশিবির?

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০৩ এএম

বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলের গণ-অভ্যুত্থান, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের একজন সমন্বয়ক সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে ছাত্রশিবিরের কোনো প্রেসনোট চোখে না পড়লেও শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি দলের ঢাবি শাখার নেতার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন বা সমর্থন দিয়েছেন। তবে শিবির সভাপতির পরিচয় প্রকাশ্যে আসা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন তোলপাড়। এই আলোচনার ভাইভ বুঝতে গেলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ বুলাতে হবে, মূলধারার গণমাধ্যমে এই আলোচনার খুব একটা প্রভাব ফেলেনি।

২০০৮ সালের পর এই প্রথম ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি প্রকাশ্যে আসার পর এখন মূলত আগ্রহের বিষয় শিবিরের গোপন রাজনীতি নিয়ে। তবে স্বঘোষিত সভাপতিকে নিয়ে আলোচনার আরেকটি কারণ তিনি আন্দোলনের সঙ্গে খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। শিবির আন্দোলনের সঙ্গে ছিল এটা খুব একটা অবাক করার বিষয় বলে মনে হয়নি। গণমাধ্যমে অনেক আগেই আন্দোলনে শহীদ ৮৭ জনকে জামায়াত বা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে।

এই শিবির সেই শিবির : আমি যখন স্কুলে পড়ছি, তখন বিএনপি-জামাতের জোট সরকার ক্ষমতায়। মাঝে মাঝে এক শিবির নেতা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে এসে ছাত্রদের কিশোর কণ্ঠ, স্টিকার, ক্যালেন্ডার দিতেন। ভীষণ নিরীহ গোছের মানুষ মনে হতো তাকে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা চাপিয়ে দেওয়া ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর দেশে ছাত্রশিবির-ছাত্রদলের রাজনীতি অনেক বেশি সীমিত হয়ে পড়ে। খুব সম্ভবত তখন থেকে শিবির রাজনৈতিক কৌশলের বদল ঘটায়।

২০১৬ সালে গ্রামে গিয়ে আমি এক অদ্ভুত তথ্য পাই, শিবির ও ছাত্রদলের অনেক তরুণ এলাকায় থাকে না দীর্ঘদিন। তারা হয় মধ্যপ্রাচ্যে/ ইউরোপে চলে গেছে, নতুবা অন্য কোনো জেলায় অবস্থান করছে। কিন্তু ঐ সময়ে থানাগুলোকে শিবির ও ছাত্রদল ধরার টার্গেট দিয়ে দেওয়া হতো। যেহেতু আসল শিবির গা-ঢাকা দিয়েছে, ফলে নামাজ পড়া, ধর্ম মেনে চলে কিছু নিরীহ শিক্ষার্থী পুলিশি হয়রানি, মামলা, হামলার শিকার হয়। তখনই আমরা শুনি শিবির গোপন রাজনীতির কৌশল নিয়েছে। সমসাময়িক সময়ে আমি পড়ি মহিউদ্দীন আহমদের ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের’ বইটি। আমার ওভার থিংকিং ফিকশন চিন্তা তখন শিবিরকে আরেকটি জাসদের মোড়ক ভাবতে লাগল।

শিবির কেন প্রকাশ্য রাজনীতিতে : ছাত্রশিবির নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করতে পারত। কিন্তু তারা সমন্বয়ক হিসেবে থাকা ছাত্রশিবিরের সভাপতিকে যে সামনে আনল সেটাও একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারটি অরাজনৈতিক ব্যানার হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে সমস্ত ফোকাস যেন হাসনাত-সারজিসের ওপর। এই মুহূর্তে শিবির আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ততাকে প্রকাশ্যে এনে ২০২৪-এর ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের এই অধ্যায়ের কৃতিত্বের ভাগীদার হয়ে ইতিহাসের অংশ হতে চায়।

শিবিরকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এক শক্তিশালী নেটওয়ার্কের ছাত্র সংগঠন বলে মনে হয়। তবে শিবিরের গোপন রাজনীতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ গল্প ওভার হাইপড। গোয়েন্দাদের মতো ট্রেনিং প্রাপ্ত বলে যেসব থ্রিলার গল্প ছড়ানো হচ্ছে এসব ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক কৌশল বৈ কিছু নয়। শনিবার বিকেলের পর যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যায়নি সে বাংলাদেশের বর্তমান পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ সম্পর্কে ধারণাই করতে পারবে না। ঢাবি ছাত্রশিবিরের আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনেক থ্রিলার গল্প ছড়িয়ে পড়ে। এটা শিবিরের নিজেকে ‘মোর দ্যান স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন’ দেখানোর ও প্রতিপক্ষ সংগঠনগুলোকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে হারিয়ে দেওয়ার কৌশল বলেই মনে হয়। আমাদের বর্তমান সময়ের পলিটিক্যাল ও পাবলিক কমিউনিকেশনের ধরন বদলে গেছে। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ন্যারেটিভ তুলে দেওয়া বা হারিয়ে দেওয়ার ‘পলিটিক্যাল টাগ ওয়ার’ চলে। হাসিনা রেজিমকে ছাত্র-জনতা মাঠে হারানোর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় হারিয়েছে। রাজাকার সেøাগান ইস্যুতে সমস্ত বয়ানকে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় খারিজ করে দিয়েছি। ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখার সময়কার গণহত্যার ভিডিও, ছবি, স্টোরি সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বন্যা তৈরি করেছে তাতে হাসিনার সাইবার স্পেসে টিম আর পেরে ওঠেনি। তাদের সে মনস্তাত্ত্বিক হার মাঠেও প্রভাব ফেলে।

প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসা শিবিরের প্রতি প্রশ্ন : শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতিকে স্বাগত। প্রকাশ্য রাজনীতির ফলে অন্য সংগঠনে শিবিরের অনুপ্রবেশ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বের করা হয় তা বন্ধ হবে। শিবিরের রাজনীতিকে সাধারণ ছাত্ররা কতটা গ্রহণ বা বর্জন করবে তা নির্ধারণ করবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। তবে শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার পর তাদের আরও কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া যায়। এক. গত দশ বছরের আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির পর তাদের আদর্শিক জায়গায় কট্টর অবস্থান বিশেষ করে ওহাবিজম ও মওদুদীবাদের কট্টর যে ধারাগুলো তারা পোষণ করে এবং সুফিবাদের প্রতি তাদের যে বিরোধ সেখানে তাদের কোনো অবস্থার পরিবর্তন হলো কিনা! দুই. ১৯৯০, ২০২৪ এসব যেমন আমাদের দেশের ইতিহাসের অনন্য উপাদান, ইতিহাসের অনন্য সূর্যোদয় হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে, সে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে শিবিরের অবস্থান কী! ৩. ক্যাম্পাস ‘নিয়ন্ত্রণের’ রাজনীতি, সহ-শিক্ষা ও নারী শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান নিয়ে তাদের নতুন কোনো পরিবর্তন আছে কি না!

বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন ‘টক অব দ্য টাউন’ ছাত্রশিবিরের গোপন রাজনীতি ও অন্য সংগঠনে নিজ দলের সদস্যদের অনুপ্রবেশ ঘটানো নিয়ে। শিবির বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আড়ালে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে রাজনীতি করতে হয়েছে প্রকাশ্যে। ফলে এক সময় গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা, লুকিয়ে জীবন পার করা এসবে বেশি ভুক্তভোগী হয় ছাত্রদল। অসম্ভব কঠিন সেসব দিনে টিকে থাকার মাধ্যমে ছাত্রদল ইতিমধ্যে রাজপথে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। হরতালের সময় নারায়ণগঞ্জ এলাকার একটি ছোট ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়, যেখানে পুলিশের হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায়ও চোখ লাল করে, সিনা উঁচু করে ছাত্রদলের দুই কর্মীকে ‘ক্ষমতা না জনতা’ সেøাগান দিতে দেখা যায়। সে ভিডিও আসলে ছাত্রদলের টিকে থাকার লড়াইয়ের একটা প্রতিচ্ছবি। 

আওয়ামী লীগের পতনের পর ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনে এই মুহূর্তে ছাত্রদলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবির। বর্তমানে রাজপথের লড়াইয়ে ছাত্রদল শক্তিশালী থাকলেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতির জায়গায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। নতুন যে রাজনৈতিক প্যাটার্ন সেখানে মেধার লড়াইয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। মনে রাখা দরকার বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হচ্ছে ছাত্রদল। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যেও সেটা স্পষ্ট। তিনি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথাই কেবল বলেননি, নতুন চিন্তার চর্চার পাশাপাশি অতীতের বিষোদগার থেকেও বের হয়ে সামনে আগানোর কথা বলেছেন। চিন্তা ও বাকস্বাধীনতার পাশাপাশি মানুষের শৈল্পিক স্বাধীনতা ও চর্চার মুক্ত পরিবেশের কথা বলেছেন। ছাত্রদলকে এখন সেটা অ্যাড্রেস করে নতুন রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। সেটা শিবিরের ঢাবি সভাপতি বুঝতেও পেরেছেন। তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি ‘নতুন রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ বলে দ্বিমতকে স্বাগত জানিয়ে ‘যুক্তির পাথরে বিক্ষিপ্ত হতে চান’ বলে লিখেছেন। হকিস্টিক, স্টাম্প, গণরুমমুক্ত ছাত্ররাজনীতিকে বিদায় এবং গবেষণা ও পলিসি ডায়ালগের কথা বলেন। এসব ইঙ্গিত করে ছাত্রশিবির বিগত সময়ে অভিজ্ঞতায় বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষাগত পরিবর্তনের একটা প্রস্তুতি নিয়েছে।

এটা সত্য গোপন রাজনীতি জনপ্রিয় হয় না। কিন্তু একটি দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরি করা যায়। ছাত্রশিবির চেইন অব কমান্ড ও অ্যালামনাইয়ের মাধ্যমে বৃহত্তর একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ছাত্রদলের রাজনীতি এখনো বুর্জোয়া। ব্যক্তির পদ পরিবর্তনে তৃণমূলের নেতা ও সুবিধাভোগী বদলে যায়। আদর্শিক জায়গা শক্তিশালী করার চেয়ে নিজের কর্মীবাহিনী দেখিয়ে পদ-পদবি বাগিয়ে নেওয়ার চর্চা আছে। যা ছাত্রলীগের রাজনীতিরও একটি বৈশিষ্ট্য। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা নিয়ে তৃণমূল ছাত্রদলের বোঝাপড়া পরিষ্কার করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া ২০০৮ সালের পর যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সেখানে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্পষ্ট ঘোষণা আছে, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলা আছে, তা নিয়ে ছাত্রদলের স্টাডি মজবুত করতে হবে। কলামিস্ট ও বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: নাগরিক ও জাতিবাদী জাতীয়তাবাদের সংকট’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। অ্যাকাডেমিকলি বেশ সমৃদ্ধ বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে যারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে আগ্রহী তাদের কাছে বইটি বেশ সমাদৃত হবে। কিন্তু বইটির আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। আমি বলব, আগামী রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যারা ছাত্ররাজনীতি করতে চান, তাদের পড়ার টেবিলে বসতে হবে। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম মোকাবিলা রপ্ত করতে হবে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবস্থান মজবুত করতে হবে। এই জায়গায় আমরা কতটা প্রস্তুত? 

হাসিনা বাংলাদেশে যে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার ভুক্তভোগী ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, বাম সংগঠনসহ সবাই। পিয়াস করিম থেকে শুরু মোশতাক আহমেদ, শহীদুল আলম থেকে শুরু করে জামাতপন্থি পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকও। ফলে এই ফ্যাসিবাদ হটাতে সবাই মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এটা নিশ্চিত, এই ঐক্য তৈরি না হলে হাসিনার পতনও সম্ভব ছিল না। নতুন বাংলাদেশে যে যার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ফিরে যাবে এটাও বাস্তবতা। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষায় সর্বদলীয় একটি বোঝাপড়া নতুন বাংলাদেশে দরকার।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত