মামলা এখনো বিএনপির মাথাব্যথা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১০:৪৭ এএম

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছর ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বাছবিচার ছাড়াই মামলা হয়েছে পাইকারি হারে। তার মধ্যে দলটির প্রধান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বেশ কয়েকজন নেতার মামলা গুরুত্ব দিয়ে নিষ্পত্তি হয়, যাতে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও দেওয়া হয়েছে। এ বিপুলসংখ্যক মামলা ও সাজা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যে দুশ্চিন্তা ভর করেছে। দলটির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, ঢাকার বিভিন্ন আদালতে গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত দেড় হাজার নেতাকর্মীকে সাজা দেওয়া হয়। যাদের অধিকাংশই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে ছিলেন।

দপ্তরের দায়িত্বে থাকা নেতারা জানান, ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে ১ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। যাতে আসামি করা হয়েছে ৬০ লাখ মানুষকে। এসব মামলা তুলে নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে দলটি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। তার আগে চলতি মাসের প্রথম দিকে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীদের নামে হওয়া মামলার নথি কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে তৃণমূলে চিঠি পাঠায় দলটি।

জানা গেছে, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত ওই চিঠির সঙ্গে মামলার বিবরণের একটি ছকও পাঠানো হয়েছে। যেখানে পাঁচটি তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নেতাকর্মীদের নিজ নিজ জেলা আইনজীবী ফোরামের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট ছকে মামলার সংগৃহীত তথ্য দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে আমরা এ সংগ্রাম করছি। এ সময় কোনো ঘটনা না ঘটলেও গায়েবি মামলা দিয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি রেখেছি এ গায়েবি ও মিথ্যা মামলা যাচাই-বাছাই শেষে যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।’

মামলার তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানোর বিষয়ে বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা করা শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পাইকারি হারে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহে গত ২ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে জেলা ও মহানগর শাখায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের নেতাকর্মীদের মামলার সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহের পর দল পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে।’

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিগত দিনে মিথ্যা অভিযোগে হওয়া রাজনৈতিক মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করানোর বিষয়টি দলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিরোধী দলগুলোর যেসব নেতাকর্মী গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। এ মামলাগুলো যতক্ষণ না প্রত্যাহার করা হবে, ততক্ষণ প্রশ্ন থেকেই যাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালতের বারান্দায় দলের নেতাকর্মীদের ঘোরাঘুরি কমলেও হাজিরা দেওয়া বন্ধ হয়নি।

সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশের নেতাকর্মীদের মামলার তথ্য বিবরণী পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বিএনপি। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে মামলার এ হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এসব মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তালিকা অন্তর্বর্তী সরকারকেও দেওয়া হবে। বিএনপি মনে করে, দেশে ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে হওয়া মামলা প্রত্যাহার হওয়া প্রয়োজন। গত সোমবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দেওয়া হবে। তার আগে সব জেলার কমিটিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলার তালিকা নেওয়া হবে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং তার আগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন গত ৬ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হওয়া সাত বছরের সাজা মওকুফে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। গত ৩ সেপ্টেম্বর মানহানির পাঁচ মামলা থেকেও খালাস পান তিনি। সব মিলিয়ে গত এক মাসে সাতটি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন খালেদা জিয়া। তবে এখনো তার বিরুদ্ধে হওয়া ৩০টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলা থেকে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হাঁটছেন তার আইনজীবীরা। তাদের প্রত্যাশা, শিগগিরই সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হওয়া ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক’ মামলাগুলো থেকে পুরোপুরিভাবে মুক্তি পাবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যত মামলা আছে, তার সবই ভিত্তিহীন। দেশে আইনের শাসন কায়েম থাকায় সব মামলা থেকে তিনি শিগগিরই আইনগতভাবে মুক্তি পাবেন।’

জানা যায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ, ঋণখেলাপি ও মানহানির মতো অভিযোগে মামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ২০১৫ সালে। পুলিশ, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও আইনজীবীরা এসব মামলা করেন। ২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময় চারটি মামলা হলেও বাকিগুলো পরবর্তী সময়ের।

বিএনপি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এখনো তিনটি মামলা বিচারাধীন, স্থগিত আছে ১৪টি, আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে ৩টির, কয়েকটি তদন্তাধীন। আর কয়েকটি মামলায় জামিনে আছেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হওয়া ৩৭টি মামলার মধ্যে দুর্নীতির পাঁচটি, মানহানির পাঁচটি এবং রাষ্ট্রদ্রোহ ও ঋণখেলাপির মামলা একটি করে। বাকিগুলো হত্যা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ‘মিথ্যা’ জন্মদিন পালন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে করা হয়। ঢাকায় ২৮টি ও ঢাকার বাইরে হয় ৯টি মামলা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত