ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে এসেছে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। গত শনিবার ঢাবি প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়ার পর গণমাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দেন শিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুল কাদেরের মাধ্যমে গত রবিবার সেক্রেটারি এসএম ফরহাদ হোসেনের পরিচয় প্রকাশ পায়। সূত্র বলছে, শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ্যে আসতে পারে সংগঠনটির।
ঢাবি ক্যাম্পাসে শিবির প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় এ নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। এ ছাড়া সেক্রেটারি ফরহাদের ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে। যদিও তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে কেউ কেউ মনে করছেন শিবিরের অনেকেই ছাত্রলীগের কমিটিতেও ছিলেন।
সূত্র আরও বলছে, যেহেতু ছাত্রলীগ ঢাবি ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত সেহেতু প্রকাশ্যে তারা শিবিরকে কোনো কার্যক্রম চালাতে দেয়নি। শিবির সন্দেহে তারা অনেককে মারধর ও হল ছাড়তে বাধ্য করেছে। শিবির না করলেও শিবির ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করত। এ ছাড়া হলে থাকতে হলেও বাধ্যতামূলকভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হতো। তাদের সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ না নিলে মারধর করে হলছাড়া করত ছাত্রলীগ। সেজন্য শিবিরের নেতাকর্মীরা ‘কৌশলে’ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং ছাত্ররাজনীতিতে গোপনে সক্রিয় থাকেন।
কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাবি ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের মিথস্ক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম পরিবেশ পরিষদে ১৯৯০ সালে শিবির ও জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে না দেওয়ার বিষয়ে মতৈক্য হয়েছিল। এরপর থেকে শিবির ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রমে সেভাবে অংশ নেয়নি। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর অনেকটা সক্রিয় ছিল শিবির। সর্বশেষ ২০১২ সাল পর্যন্ত কিছুটা সক্রিয় ছিল সংগঠনটি। এরপর থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে একদমই আলোচনার বাইরে চলে যায় ছাত্রশিবির। বিশেষ করে ছাত্রলীগ ঢাবিতে প্রকাশ্যে শিবিরকে কোনো কার্যক্রম চালাতে দেয়নি। কিন্তু গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীরা নিজেরাই এখন ‘আত্মগোপনে’ চলে গেছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৮ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এরপর থেকে ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে থাকে ছাত্রশিবির। সভাপতির প্রকাশ্যে আসার পর তাদের কার্যক্রম এবং কোটা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুল কাদের ঐতিহাসিক ৯ দফায় শিবিরের বিশেষ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে আসার বিষয়ে শিবির নেতারা বলছেন, পরিস্থিতির কারণেই এতদিন তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছেন। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার অন্যায়ভাবে তাদের মতপ্রকাশ করতে দেয়নি। গোপনে তারা সক্রিয় ছিলেন এবং আন্দোলন সংগ্রামে, বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনে তারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। হলে থাকার জন্য কৌশলে ছাত্রলীগের সঙ্গে কিছুটা হলেও সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে বলে জানান কেউ কেউ।
ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা একটি হলের শিবিরকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এতদিন অন্যায়ের শিকার হয়েছি। আমাদের মতপ্রকাশ করতে দেয়নি ফ্যাসিস্ট সরকারের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আমরা বাধ্য হয়ে তাদের সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। শুধু আমরা কেন, ছাত্রদলের অনেক কর্মীও নিজেদের প্রকাশ করতে পারেনি। প্রকাশ করলেই তাদের নির্যাতন এবং হল ছাড়া করত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। প্রকাশ করার কারণে অনেকেই আর হলে উঠতে পারেনি, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। তাদের কর্মসূচিতে অংশ না নিলে বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করা হতো। নতুন বাংলাদেশে সবাই সবার মতপ্রকাশ করতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়ার পর ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাদিক কায়েমের পরিচয় সামনে আসে। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। গত রবিবার রাতে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি জেনারেল এসএম ফরহাদের পরিচয় সামনে এলে তার পরিচিতজনদের অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। ফরহাদ ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে কবি জসীমউদ্দীন হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ক্লাবে এর ঠিক আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র এ এস এম কামরুল ইসলাম। শুধু তা-ই নয়, জসীমউদ্দীন হলে চার বছর ধরে ফরহাদের সঙ্গে একই কক্ষে থেকেছেন তিনি। ফরহাদের রাজনৈতিক পরিচয় শুনে বিস্মিত কামরুল রাতে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মানুষ অবাক হয়। মাঝেমধ্যে প্রচ- অবাক হয়। কেউ কেউ অবাক হয়ে আকাশ থেকে পড়ে।’
তবে প্রকাশ্যে আসার পর ফরহাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে। একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, এসএম ফরহাদ সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবি ভাইরাল হয়। কিন্তু ঢাবির শিবির সেক্রেটারি বলছেন, ছাত্রলীগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
গতকাল সোমবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসএম ফরহাদ বলেন, ‘সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচি ও কার্যক্রমের সঙ্গে আমার (এসএম ফরহাদ) কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ছাত্রলীগের কোনো পদ-পদবির জন্য কোনো সিভি আমি কখনো কাউকে দিইনি। ডিপার্টমেন্টের কমিটিতে কাকে রাখা হবে সেটা সংশ্লিষ্ট ছাত্রলীগের সিদ্ধান্ত। সেখানে আমাকে কেন জড়ানো হচ্ছে, যেখানে আমি ডিপার্টমেন্ট ছাত্রলীগের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই। এ বিষয়টিকে আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের স্পিরিট ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র মনে করি।’
প্রকাশ্যে কার্যক্রম না চালালেও ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে ছিল না বলে জানিয়েছেন ছাত্রশিবিরের ঢাবি শাখার সভাপতি সাদিক কায়েম। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যেভাবে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল, সেটির কারণেই আমরা এতদিন প্রকাশ্যে আসতে পারিনি। এখন যেহেতু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, সেহেতু তারা বাদে বাকি সব সংগঠনের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ক্যাম্পাসে আমরা সুস্থ ধারার রাজনীতি করতে চাই। শিগগিরই আমাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিও প্রকাশ করা হবে।’
