সিএসকের সুপার ফ্র্যাঞ্চাইজি হয়ে ওঠার রহস্য

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৩৯ এএম

চেন্নাই সুপার কিংসের ব্র্যান্ডভ্যালু ভারতের ক্রীড়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর সবচেয়ে বেশি, বিশ্বের সবচেয়ে দামি। ছোট্ট একটা ধারণা থেকে দেড় দশকে এই অর্জনের পেছনের অন্যতম কারিগর চেন্নাই সুপার কিংসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাশি বিশ্বনাথন। চেন্নাই টেস্ট দেখতে এসে দেশ রূপান্তর-এর সামীউর রহমানের সঙ্গে আলাপ করেছেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ব্যবসা চালানোর সফল কৌশল নিয়ে।

প্রশ্ন : চেন্নাই সুপার কিংস দলটা তৈরির ধারণাটা কীভাবে আপনাদের মাথায় এলো? কেন আপনাদের মনে হয়েছিল ক্রিকেটে এত টাকা বিনিয়োগ করা যায়?

কাশি বিশ্বনাথন : এ জন্য সমস্ত কৃতিত্ব দিতে হয় এন শ্রীনিবাসনকে, যে মানুষটি সাহসী স্বপ্ন দেখেছিলেন। শ্রীনিবাসন সে সময় ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সচিব ছিলেন এবং তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনেরও চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে শ্রীনিবাসন ইন্ডিয়া সিমেন্টসেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ইন্ডিয়া সিমেন্টস ১৯৬০ সাল থেকে ক্রিকেটে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। তাই যখন সুযোগ এলো শহরভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়ার, শ্রীনিবাসন চাননি যে চেন্নাইয়ের বাসিন্দারা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হোক। আপনি নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছেন ক্রিকেটের প্রতি চেন্নাইয়ের মানুষজনের ভালোবাসা। এখানে টেস্ট ম্যাচ দেখতেও ১৭ হাজার মানুষ এসেছে, ক্রিকেট নিয়ে এখানকার মানুষজনের ভালোবাসাকে সম্মান জানাতেই আমরা আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়ার চিন্তা করেছিলাম, আর এখন তো চেন্নাই সুপার কিংস এই শহরের মানুষদের প্রথম ভালোবাসা।

প্রশ্ন : সিএসকে তো বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও দল কিনছে, কখনো কি মনে হয়েছে যে বিপিএলেও একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি নিতে পারে?

বিশ্বনাথন : আসলে আমাদের এই মুহূর্তে এ রকম কোনো পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আদৌ বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের বাইরে কারও কাছে ফ্র্যাঞ্চাইজির স্বত্ব বিক্রি করবে কি না সে ব্যাপারেও আমাদের কোনো ধারণা নেই। বর্তমানে ভারতের বাইরে দুটো লিগে আমাদের দল আছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্র; এর বাইরে যে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ যেটা চেন্নাই সুপার কিংসের মূল বৈশিষ্ট্য কিংবা কার্যপ্রণালীর সঙ্গে যায় এ রকম যে কোনো কিছুর সঙ্গেই আমরা থাকতে ইচ্ছুক। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সে রকম (বাংলাদেশে বিনিয়োগ) কোনো পরিকল্পনা নেই।

প্রশ্ন : দলের পাশাপাশি একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবেও সিএসকে সফল। এর পেছনের রহস্যটা কী? সিএসকে কী কী ভাবে আয় করে থাকে?

বিশ্বনাথন : দেখুন, প্রতিটা ফ্র্যাঞ্চাইজির আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয়। বিসিসিআই আইপিএল-এর সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রাপ্ত আয় প্রতিটা ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে সমানভাবে ভাগ করে। এরপর আছে স্পন্সরশিপ। খেলোয়াড়দের জার্সির বিভিন্ন অংশ যেমন চেস্টপ্লেট, আর্মসিøভ এ রকম কয়েকটা অংশে লোগো বসানোর মাধ্যমে স্পন্সরদের কাছ থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা অর্থ পায়। এর বাইরে আছে গেট মানি, অর্থাৎ হোমভেন্যুর ম্যাচগুলোর টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ। এই হচ্ছে আমাদের আয়। এর বাইরে খেলোয়াড়দের বেতন, সাপোর্ট স্টাফদের বেতন, ভ্রমণ, আবাসন,পরিচালনা ব্যয়, বিজ্ঞাপন, মাঠের জন্য স্থানীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনকে হোস্টিং ফি দেওয়া... এসব হচ্ছে খরচ। এখন সহজ সূত্র হচ্ছে আয়ের চেয়ে খরচ কম হলেই লাভ হবে। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজিকে লাভজনক করে তুলবে মাঠের পারফরম্যান্স। দল মাঠে ভালো না করলে কিন্তু সমর্থকরা আসবে না আর পৃষ্ঠপোষকরাও আসবে না।

প্রশ্ন : ভারত থেকে প্রথম কোনো স্পোর্টস ভেঞ্চার হিসেবে ইউনিকর্ন অর্থাৎ ১ বিলিয়ন ডলারের ওপর মূল্যায়ন পাওয়া স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে চেন্নাই সুপার কিংস। যখন ১৬ বছর আগে কি ভেবেছিলেন একদিন এই ব্র্যান্ড এত বড় কিছু হবে?

বিশ্বনাথন : সত্যি কথা বলতে, আমরা নিজেরাও বিশ্বাস করিনি যে এতদূর পর্যন্ত আসতে পারব। কারণ ঐ সময়ে যখন টি-টোয়েন্টি এলো তখন আমরা নিজেরাও জানতাম না যে চেন্নাই সুপার কিংস এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এ জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই সব ফ্যানদের, যারা সবসময় আমাদের পাশে ছিল। তবে যাত্রাটা সহজ ছিল না। আমাদের ৮ বছর লেগেছে কেবল আয়-ব্যয় সমান করতেই। এখন আমরা একটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান, গত কয়েক বছর ধরে আমরা লাভের মুখ দেখছি।

প্রশ্ন : সিএসকের জনপ্রিয়তার পেছনে এম এস ধোনির একটা অবদান আছে, ২০০৮ সালে আপনারা ধোনিকে কেন বেছে নিয়েছিলেন?

বিশ্বনাথন : আইপিএলে সে সময় আইকন প্লেয়ারের নিয়ম ছিল। ঐ রাজ্যের বা অঞ্চলের একজন ক্রিকেটারকে কোনো দল আইকন ক্রিকেটার হিসেবে নিতে পারত। তাকে নিলামে আসতে হবে না, দলের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ক্রিকেটারের চেয়ে ১৫% বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে। এভাবে শচিন মুম্বাইয়ের, যুবরাজ সিং পাঞ্জাবের হয়ে গেল। চেন্নাইতে কোনো আইকন ক্রিকেটার ছিল না। আর আমাদের একজন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানও দরকার। সেই সঙ্গে আমরা বুঝতে পারছিলাম, ধোনি ভবিষ্যতে ভারতের বড় একজন তারকা হতে যাচ্ছে। তাই আমরা ওকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটাই কাজে লেগে যায়।

প্রশ্ন : একটা সফল ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান নির্বাহী হিসেবে, আগামীতে যারা ক্রিকেট লিগে ফ্র্যাঞ্চাইজি নেবেন বা নিতে আগ্রহী, তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?

বিশ্বনাথন : আমি তাদের বলব, ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের ওপরেই যেন মনোযোগটা বেশি থাকে, কারণ ক্রিকেটারদেরই এখানে প্রধান ভূমিকা থাকে একটা ফ্যানবেজ গড়ে তোলার জন্য। একটা দলের ফ্যানবেজ গড়ে তুলতে কমপক্ষে তিনটা মৌসুম লাগে। দলের পারফরম্যান্সই ফ্যানবেজ গড়ে তুলবে আর সেটাই ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে বড় সম্পদ। ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের তরফ থেকে আমরা কখনো ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করি না। আমরা পরিচালনা, বাণিজ্যিক, লজিস্টিক এই ব্যাপারগুলো দেখি। ক্রিকেটের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের ক্রিকেট দলের লোকেরা আছেন। অর্থাৎ কোচ, অধিনায়ক এবং অন্য যারা সাপোর্ট স্টাফ। তাদের আমরা কোনোভাবেই প্রভাবিত করি না। এটাই আমাদের সাফল্যের রহস্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত