সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আহসান আবিদ কাব্য (২২)। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার দাবিতে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে প্রথম থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথের আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলা এ আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় কলেজের বড় ভাই এবং চাচাতো ভাইসহ অন্য আরও অনেকেরই ছিলেন চক্ষুশূল। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী কাব্যকেই। শুধু তাই নয়, একই মামলায় আসামি করা হয়েছে তার বাবাকেও। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাব্যের সহপাঠী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিরাজগঞ্জ জেলার সমন্বয়করা।
আন্দোলনের সমন্বয়করা বলছেন, কাব্য ও তার বাবাকে মামলার আসামি করার কারণ জানতে বাদীকে খোঁজার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। মূলত প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে। আর পুলিশ বলছে, এখন তাদের কিছুই করার নেই। তদন্তে যদি কাব্য ও তার বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে তাদের নাম বাদ যাবে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ সদর থানা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে আ. লতিফ (৩৫) নামে একজন নিহতের ঘটনায় তার বোন মোছা. সালেহা খাতুন (৩৭) বাদী হয়ে মামলা করেন। সেই মামলায় ১৫৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারে ৭৪ নম্বর আসামি করা হয় কাব্যকে। আর ৬২ নম্বর আসামি করা হয় তার বাবা কুদ্দুস হোসেনকে। একসময় কাব্যের বাবা বিএনপিপন্থি রাজনীতি করলেও এখন কোনো রাজনৈতিক দলেও সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জ জেলার ছাত্র-জনতা স্টেশন বাজার থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি বড়পুলের দিকে যাওয়ার পথে এসএস রোডে জেলা আওয়ামী লীগ অফিসের উত্তর পাশে গেলে পূর্ব থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা, ছোরা, হকিস্টিক, লোহার রড, বাঁশের লাঠি নিয়ে প্রস্তুত থাকা নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এ সময় লতিফকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” বলে স্লোগান দিয়ে উল্লাস করতে থাকে।’
সরকার পতনের আন্দোলনে প্রথম থেকে সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করে আহসান আবিদ কাব্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে বিভিন্ন সময় হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। বাড়ির চাচাতো ভাইয়েরা মারধর করবে বলেও জানান। তারপরও কোটা সংস্কার আন্দোলন যৌক্তিক মনে করে আমি সক্রিয় ছিলাম। কিন্তু দিন শেষে আমার নামেই মামলা করা হলো। আমার বাবার নামে মামলা হলো। আমরা কি এই স্বাধীনতা চেয়েছি?’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই মাসে আমাদের কলেজে তেমন কোনো মিছিল-মিটিং হয়নি। তবে আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধ করে গিয়েছিলাম। প্রতিটি মুহূর্তে আপডেট তথ্য জানিয়েছি। গ্রুপ খুলে সবাইকে যুক্ত করে একটা প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছি। গত ৪ আগস্ট কলেজ থেকে মিছিল বের করে জামতৈল ধোপাকান্দি সরকারি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দিকে গেলে আওয়ামী লীগের লোকজন ধাওয়া দেয়। পরে সালেহা ইসহাক সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা অংশ নিয়ে আন্দোলন করেন। আন্দোলনে আমাদের বন্ধু, কাছের বড় ভাই, ছোট ভাই আহত হয়েছে। তাদের নিয়ে হাসপাতালে দেখাশোনা করেছি। এ আন্দোলনে এতকিছু করেও আমার নামে মামলা হয়েছে, এখন আমি বাড়ি যেতে পারছি না। আন্দোলনকারী একজন শিক্ষার্থী হয়েও আমাকে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে।’
কাব্যর ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের কর্মীরা সাধারণ ছাত্রদের মারধর করেছে এমন একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করেন। ১৬ জুলাই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্র’ শিরোনামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেন। ১৮ জুলাই শেয়ার করেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আন্দোলনের পক্ষে কথা বলার একটি ভিডিও ক্লিপ। একই দিন আন্দোলনকারীদের মারধরের আরেকটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে নিন্দা জানান। ৩০ জুলাই লাল কাপড় দিয়ে মোড়ানো একটি ছবি দিয়ে নিজের প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করেন। এ ছাড়া কাগজে লাল রঙ দিয়ে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র এবং রক্তের দাগ দেওয়া কিছু ছবি শেয়ার করেন। ১ আগস্ট পুলিশ সদস্যদের হাতে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ছবি শেয়ার করেন এবং ৫ আগস্ট লাল বৃত্তের মধ্যে ‘স্বাধীন’ লেখা একটি পোস্ট শেয়ার করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কাব্যর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শাওন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাব্য ও আমি একসঙ্গে আন্দোলনে ছিলাম। রাস্তায় মিছিলে গিয়েছি। আন্দোলনের শুরু থেকে ফেসবুকে অ্যাকটিভ (সক্রিয়) ছিলাম। এ ছাড়া গত ৪ আগস্ট একসঙ্গে বেরিয়ে রাস্তায় মিছিল করেছি। তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়াও খেতে হয়েছে।’
একই ধরনের তথ্য জানান ওই কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. শরীফ রেজা। তিনি বলেন, ‘কাব্য আমাদের ছোট ভাই। ও এই আন্দোলনে প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিল। অনলাইন-অফলাইনে কাজ করেছে কাব্য। কিন্তু সে ও তার বাবার বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধেই আন্দোলনে হামলার অভিযোগে মামলা হওয়াকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিরাজগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক সামিউল সাব্বির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাব্য এ আন্দোলনে ছিলেন। তাকে আমরা প্রথম থেকেই আন্দোলনে দেখেছি। কিন্তু তার বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে জেলার অন্য সমন্বয়কদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তবে মামলায় কাব্য ও তার বাবাকে যুক্ত করার কারণ জানতে বাদীকে খোঁজার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। এ মামলা মূলত প্রতিহিংসা থেকে করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি হুমায়ন কবির বলেন, ‘মামরার বাদী সালেহা খাতুন। আন্দোলনে তার ভাই মারা গেছেন, সে কারণে মামলা করেছেন। ১৫৯ জনের নাম উল্লেখ ও ১৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে কার নাম দিয়েছে বা কে কোন দল করত সে বিষয়ে আমি অবগত নই। মামলার বাদীকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন কেন সে তাদের নাম দিয়েছে।’
এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তে যদি কাব্য ও তার বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে তাদের নাম বাদ যাবে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।’
