পলিথিনের জুতসই বিকল্পের সন্ধান

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০৫ এএম

একসময়ে বাজার করা মানুষের হাতে থাকত চটের বা কাপড়ের ব্যাগ। গত শতকের নয়ের দশকের শুরুর দিকে পলিথিনের ব্যবহার শুরু হয়। সস্তা ও সহজলভ্যের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই রাজধানীসহ সারা দেশ পলিথিনের ব্যাগ চটের বা কাপড়ের ব্যাগকে হটিয়ে দেয়। একসময় পলিথিনের এমন অবাধ ব্যবহারের বিরোধিতা শুরু করেন পরিবেশবাদীরা। দশকখানেক সময়ের মধ্যেই পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে এর উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়।

শুরুর দিকে আইনের কড়াকড়ির কারণে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে পলিথিনের ব্যবহার। ধীরে ধীরে আইনের কঠোরতা শিথিল হতে থাকে। আবার দাপটে ফিরে আসে পলিথিন। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে, পণ্যটি যে নিষিদ্ধ সে কথাই মানুষ ভুলে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা যে ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ পণ্য তা এখন মনে করা হয় না। পলিথিনের বিকল্প ও সহজলভ্য পণ্য বাজারে আনতে না পারলে এর উৎপাদন বা ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। আইনের কঠোরতার পাশাপাশি বিকল্প পণ্য বাজারে আনতে হবে। মানুষকে সচেতনও করতে হবে।

পলিথিনের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে এবার কঠোর হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। হাটবাজারে এমনকি সুপারশপে পলিথিন ব্যাগ বা পলিপ্রপিলিনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেছেন, পলিথিন ব্যাগ দোকানে রাখা যাবে না, ক্রেতাদেরও দেওয়া যাবে না। পাট ও কাপড়ের ব্যাগ রাখতে হবে ক্রেতাদের জন্য। এ উদ্যোগ সফল করতে তরুণদের বা শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হবে। উপদেষ্টা বলেন, ১ অক্টোবর শুধু সুপারশপে অভিযান চালনার সিদ্ধান্ত ছিল, যা কার্যকর করা হবেই। দেশের সব ধরনের বাজার কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবর নিজ উদ্যোগে অবৈধ পলিথিন শপিং ব্যাগ বর্জন শুরু করবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। ১ নভেম্বর দেশব্যাপী এ-বিষয়ক আইন প্রয়োগ শুরু হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ২০০২ সালে সংশোধনী এনে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। আইন না মানলে বলছে, পলিথিন সামগ্রী উৎপাদনের জন্য অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ড এবং আমদানি ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি অপরাধের জন্য দুই বছর, অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা, অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ব্যবহারের জন্য অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার কারখানায় প্লাস্টিক ও পলিথিন তৈরি হয়। এসব কারখানা সবচেয়ে বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে। কারখানাগুলোয় দিনে-কয়েক কোটি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকায়ই প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি পলিথিন ব্যাগ জমা হয়।

ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব দোকানেই পলিথিনের ব্যবহার হচ্ছে। হাতভর্তি পলিথিনের ব্যাগে বাজার নিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতারা। মুদি দোকান থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, শাকসবজি, ডিম, তরকারি ও ফলের দোকান সবখানেই নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের মুদি বিক্রেতা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘পলিথিন নিষিদ্ধ এটা এই মার্কেটের সবাই জানে। কিন্তু আমরা বাধ্য হয়ে পলিথিন ব্যবহার করি। ক্রেতাদের বেশিরভাগ বাজারের জন্য আলাদা ব্যাগ নিয়ে আসেন না। আবার ব্যাগ আনলেও পলিথিনে দিতে হয়। কাস্টমার যদি সচেতন হন, তাহলে আমরাও পলিথিন দেব না।’

তার কথার প্রতিবাদ জানিয়ে ক্রেতা হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমি তো তাকে পলিথিনে দিতে বলিনি। তার মাপার সুবিধা হয়, তাই পলিথিনে দিয়েছেন। তিনি চাইলে কাগজের ঠোঙা দিতে পারতেন।’

বিক্রেতা জহিরুল বলেন, ‘আপনি তো ঠোঙার দাম দেবেন না। একটা ঠোঙার দাম ৩ থেকে ১০ টাকা। সেটা তো ফ্রিতে দেওয়া যায় না। ফ্রিতে না দিলে ক্রেতা অন্য দোকানে যাবেন। পলিথিন বন্ধ করতে হলে সবার জন্যই করতে হবে।’

পলিথিনের বিষয়ে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তকে ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনেই স্বাগত জানান। তারা বলেন, দোকানে দোকানে পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান করে লাভ হবে না। যেখানে পলিথিন উৎপাদন হয়, সেখানে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পলিথিন যে নিষিদ্ধ, সেটা জানেন না একই বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. সজিব। তিনি বলেন, ‘পলিথিন নিষিদ্ধ হলে বাজারে চলে কেন? সবাই তো পলিথিনেই মাছ নেন। একটা পলিথিনে মাছ দিলে বলেন আরও একটা দেন। কেউ আবার দু-তিনটা করে পলিথিন নেন।’

কিচেন মার্কেটের পাশে কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সব দোকানি সবজি বিক্রির ক্ষেত্রে পলিথিন ব্যবহার করছেন। মশিউর নামে এক সবজি বিক্রেতা বলেন, ‘আমার কাছে পলিথিনও আছে, বাজারের ব্যাগও আছে। পলিথিন ছাড়া কেউ সবজি নিতে চান না। সারা দিনে ১০টা বাজারের ব্যাগও বিক্রি হয় না।’

সে সময় রাকিব হাসান নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘পলিথিন পরিবেশের জন্য খারাপ আমরা সবাই জানি। অনেক দেশেই পলিথিনের বিকল্প ব্যবহৃত হয়। শুনেছি আমাদের দেশেও পলিথিনের বিকল্প আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু বাজারে নেই। বিকল্প নিয়ে এলে পলিথিন এমনিতেই উঠে যাবে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘যখন পলিথিন নিষিদ্ধের আইন হয়, তখন আমি পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ছিলাম। বলা যায়, ৯০ শতাংশ পলিথিনের ব্যবহার কমানো গিয়েছিল। তখন হাটবাজারসহ কারখানাগুলোয়ও অভিযান হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের শেষ দিকে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজধানীসহ সারা দেশে এখন ১ হাজার ৫০০ কারখানা। একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ঢাকার পলিথিন-ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। কারখানাগুলোও বন্ধ করতে হবে। না হলে শুধু অভিযান করে পলিথিন রোধ করা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘যখন পলিথিন নিষিদ্ধের আইন হয়, তখনই কিন্তু এর বিকল্প চলে আসছিল। কিন্তু পলিথিনের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেগুলো বাজার থেকে উঠে যায়। এখন প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে। আমাদের দেশে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে সোনালি ব্যাগের আবিষ্কার হয়েছে। পাটের সোনালি ব্যাগ বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষকেও সচেতন করতে হবে। তাহলেই পলিথিন রোধ করা সম্ভব হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত