আইনি হয়রানির সিন্ডিকেট ভাঙব

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৫০ এএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১৭তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান। দায়িত্ব নেওয়ার পর আইন ও বিচারাঙ্গনের নানা বিষয় নিয়ে তার ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উৎপল রায়

দেশ রূপান্তর: একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছেন। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছেন কীভাবে?

আসাদুজ্জামান: বিচার বিভাগে এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হলো সিন্ডিকেট। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি। দায়িত্ব নিয়ে আমি এ ধরনের আরও অনেক পরিস্থিতি পেয়েছি। একসময় প্রতিদিন সকালবেলা মন্ত্রণালয় থেকে বিচারকদের কাছে তদবির করা হতো ওমুককে ধরো, তমুককে ছাড়ো। এ পরিস্থিতি দূর করা দুরূহ হলেও আমার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে না। মোটকথা হলো, অহেতুক মানুষকে হয়রানি করা যাবে না। বিচার বিভাগের যে সিন্ডিকেট মানুষকে হয়রানির কারণ, সেটি ভেঙে দিতে চাই। বিচারকরা যেন মেরুদন্ড সোজা করে বিচারকাজ করতে পারেন, সেই পরিস্থিতি দেখতে চাই।

দেশ রূপান্তর: গত ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে একটি অনুষ্ঠানে আপনি বলেছিলেন, গত দেড় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ‘মব জাস্টিস’-এ বেশ কিছু অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এগুলো কি বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়?

আসাদুজ্জামান: এগুলো সেই অর্থে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সংঘটিত হত্যাকা-কে বোঝানো হয়।

দেশ রূপান্তর: দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু অতীতে এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয়ও দেখা গেছে...

আসাদুজ্জামান: দেখুন, অ্যাটর্নি জেনারেল কিন্তু সরকারের কর্মকর্তা নন। তিনি রাষ্ট্রের উকিল। আর রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে সরকার। যখন কোনো বিষয় আমার সামনে দেবে, আমি সেই বিষয়ের পর্যালোচনা করে যদি দেখি আইনিভাবে এটাকে মোকাবিলা করার মতো ন্যূনতম সুযোগ আছে, আমি ততটুকু পর্যন্ত দেখব। আর যখন দেখব সুযোগ নেই, সরকারকে অবগত করব যে, এটা করে লাভ নেই। আমার এ চিন্তাভাবনা আমার অন্যান্য আইন কর্মকর্তার সঙ্গে ভাগাভাগি করেছি। ইতিমধ্যে আমি সরকারের সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বলেছি যে, আপনাদের (সরকার) এটা করা উচিত, এটা করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, সাম্প্রতিককালে ব্যাপক হারে মামলা নিয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি যে, মামলা মানেই গ্রেপ্তার নয়। মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

দেশ রূপান্তর: মামলা প্রসঙ্গ যেহেতু আনলেন, আপনার কাছ থেকেই শুনতে চাই এই যে ব্যাপক হারে মামলা, এগুলোর বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আসাদুজ্জামান: একসময় ‘গায়েবি’ মামলা একটা অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। লক্ষ করে দেখবেন, এ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ কর্তৃক এখনো পর্যন্ত একটাও গায়েবি মামলা হয়নি। যেসব মামলা হচ্ছে, আসামি করা হচ্ছে এগুলো করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তবে আসামি করার ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন আসছে। মামলা অন্য কোনো কারণে করেছে বা কারও প্ররোচনায়। সে ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্ত করে যদি মনে করে, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, কমন ইনটেনশন প্রমাণিত, তাহলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমাদের অফিস থেকে সরকারকে যে পরামর্শ দিয়েছি, সরকার সে উপদেশ শুনছে এবং ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের আমলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে মামলা দিয়ে হয়রানি করার ব্যাপক প্রবণতা ছিল। আপনি নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি দেখতে চান না।

আসাদুজ্জামান: দেড় দশকে গায়েবি মামলার যে সংস্কৃতি ছিল, সেটি আর বাংলাদেশে দেখতে চাই না। এই সংস্কৃতি দেশের সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার সর্বোপরি মনুষ্যত্বের পরিপন্থী। এই যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গায়েবি মামলা দায়ের, এটা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে যে অপরাধগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে ডেফিনেশন (সংজ্ঞা) দেওয়া হয়েছে, এগুলো (গায়েবি মামলা) মানতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে।

দেশ রূপান্তর: এখন এ অবস্থানের পর ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালনকালে যদি দেখেন যে, এ ধরনের মামলা হচ্ছে, তখনো এ অবস্থানে অনড় থাকবেন?

আসাদুজ্জামান: আমি তখনো শক্ত ভূমিকাই নেব। সরকারকে আমি সেভাবেই বলব।

দেশ রূপান্তর: গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের রিট আবেদনটি আপনি খারিজ চেয়েছিলেন। তখন আপনার কিছু বক্তব্য আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা আসলে কী?

আসাদুজ্জামান: প্রথম কথা হলো, আমি কাউকে খুশি করার জন্য এসব বক্তব্য দিইনি। এই রিট আবেদনের পিটিশনার যেসব ফরম্যাটে এসেছিলেন তাতে দেখা গেছে, তার ‘লোকাস স্ট্যান্ডি’ই (আইনগত এখতিয়ার) নেই। অন্য কারও স্বার্থ রক্ষায় এসেছিলেন। যাকে (আওয়ামী লীগ) শাস্তি বা রেজিস্ট্রেশন বাতিল চাইছেন, তাকেই বিবাদী করা হলো না। এটা আইন, সংবিধানের মৌলিক চেতনার ব্যত্যয়। আর সরকারের পলিসি হলো, যে প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) বাতিল চেয়েছেন, সেই প্রেক্ষাপটে বাতিল করার কোনো আইনি ভিত্তি এখনো তৈরি হয়নি। কারণ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে কোনো ডিক্লারেশন, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কোনো গেজেট প্রকাশ হয়নি। যে কারণে সংবিধানের ৩৬ (চলাফেরা) এবং ৩৮ অনুচ্ছেদের (সমাবেশের স্বাধীনতা) সঙ্গে এ আবেদনটি সাংঘর্ষিক। তবে ভবিষ্যতে যদি কেউ সুচারুরূপে আবেদন নিয়ে আসেন, তখন তা শুনানির জন্য আদালতের গ্রহণ করতে কোনো অসুবিধা নেই।

দেশ রূপান্তর: তখনো কি আপনি আপনার এখনকার অবস্থানেই থাকবেন?

আসাদুজ্জামান: তখন যদি আসে, জোরালো যুক্তি ও আনুষ্ঠানিক আবেদন নিয়ে আসে, যদি বিষয়টি অন্যরকম থাকে যে, আওয়ামী লীগকে বিবাদী করা হয়েছে বা অন্য কিছু থাকে, তখন তো সে বিষয়ে বলতে হবে।

দেশ রূপান্তর: কয়েক দিন আগে সুপ্রিম কোর্টে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিগত দেড় দশকে বিচারকরা ন্যায়বিচারের ঝান্ডা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আসাদুজ্জামান: ফ্যাসিবাদের সময়ে বিচার বিভাগকে সরকার যেভাবে ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করেছে বা বিচার বিভাগের কেউ কেউ অতিউৎসাহী হয়ে ব্যবহৃত হয়েছেন, যার ফলে কর্তৃত্ববাদ সরকারের গণতন্ত্র হত্যা করতে সহায়তা করেছে এবং সেসব বিচারক যারা এসব বিষয়ে ভূমিকা পালন করেছে ‘দে শুড বি অ্যাকাউন্টেবল’।

দেশ রূপান্তর: বিগত সময়ে মামলাজট নিয়ন্ত্রণ, বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি নিরসনে কার্যত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা কী হবে। বিচারপ্রত্যাশীর দুর্ভোগ কি কমবে?

আসাদুজ্জামান: মামলাজটের বেশ কিছু কারণের মধ্যে একটা হলো, দেড় লাখের ওপর গায়েবি মামলায় ৬০ লাখের ওপর আসামি। সরকার রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে বড় ধরনের মামলাজট কমবে। দ্বিতীয়ত বিচার বিভাগকে আরও বেশি প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। যদি তা হয় এবং ম্যাকানিজম বের করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ, ছোটখাটো বিষয়গুলো কীভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলেও অনেক মামলা কমে আসবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যদি এমন কোনো উদ্যোগ নেয়, একই মামলার প্রকৃতির বিষয়ে একজনকে যে বেনিফিট দেওয়া হচ্ছে, ওই বিষয়ে একই ধরনের সিদ্ধান্ত অন্যদের ক্ষেত্রেও নেওয়া হবে, তাহলে অনেক মামলা তৈরি হবে না।

দেশ রূপান্তর: এ ক্ষেত্রে শত বছর বেশি পুরনো আইনের সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি না?

আসাদুজ্জামান: পুরনো আইন সংস্কার হতে পারে। কিন্তু সংস্কারের আবার কিছু জটিলতাও তৈরি হয়। পুরনো আইন বাদ দিয়ে নতুন আইন তৈরি করতে হলে নতুন আইনে কোনো না কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায়। এটার থেকে আবার মামলার উদ্ভব হবে। তাই পুরনো আইনগুলোকে একটু যুগোপযোগী করলে সেটা ভালো হবে।

দেশ রূপান্তর: অতীতে আইন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে। এমনকি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি, রক্তারক্তির মতো ঘটনা ঘটেছে।

আসাদুজ্জামান: আমাদের আইন কর্মকর্তারা পেশাদার। তাদের একটা বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে, তার ক্লায়েন্টকে সার্ভিস দেওয়া। যদি আইন কর্মকর্তা এটির বাইরে যায় তাহলে সেটি হবে পেশাগত লঙ্ঘন। আর কেউ যদি আচরণ লঙ্ঘন করে তাহলে তার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়, বার কাউন্সিল আছে। দেখবে। আরেকটি বিষয় হলো, আইন কর্মকর্তা হয়েছেন বলে তিনি রাজনীতি করতে পারবেন না, তার কোনো রাজনৈতিক দর্শন থাকবে না, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না, এটাও ঠিক নয়। এ নিয়ে বাধাগ্রস্ত হলে তার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হবে। আইন কর্মকর্তা যেহেতু সরকারি কর্মচারী নন, তার রাজনৈতিক দর্শন, চিন্তাচেতনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা যেন পেশাগত জায়গায় প্রভাব না পড়ে, পেশার ক্ষতি না হয়। আর এ ধরনের (মারামারি) ঘটনাগুলো অবশ্যই ভবিষ্যতে আর দেখতে চাই না।

দেশ রূপান্তর: পদাধিকারবলে আপনি বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। এ সংস্থার সংস্কার নিয়ে অনেক দিন ধরে কথা হচ্ছে।

আসাদুজ্জামান: বার কাউন্সিল এখন অনেকটা অকার্যকর অবস্থায় আছে। বেশিরভাগ সদস্য হয় পলাতক না হয় তাদের স্বার্থ হারিয়েছেন। আইনজীবীদের যে ম্যান্ডেট তাও পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। সব মিলিয়ে সংস্কারের বিষয়টি এখনো চিন্তা করিনি। তবে এটি হওয়া উচিত বলে মনে করি।

দেশ রূপান্তর: সাম্প্রতিককালে আদালতে আসামিদের ওপর হামলার ঘটনায় আইনজীবীদের দিকে অভিযোগের তীর।

আসাদুজ্জামান: এগুলো অপ্রীতিকর ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। আমরা কখনোই এ ধরনের ঘটনা সমর্থন করি না। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছি। ইতিমধ্যে আগের সে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে বলে লক্ষ করা যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর: আপনাকে ধন্যবাদ।

আসাদুজ্জামান: দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত