বকেয়া বেতন পরিশোধ, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া ও কিছু এলাকায় হওয়া শ্রমিকদের নামে মামলা প্রত্যাহারসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে গতকাল শনিবারও বিক্ষোভ করেছেন ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি খাতের কারখানার শ্রমিকরা। বিক্ষোভের কারণে গতকালও ওই এলাকার বেশ কিছু কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় সৃষ্টি হয় যানজটও। ভোগান্তিতে পড়েন ওইসব এলাকা দিয়ে সড়কপথে চলাচলকারীরা।
দেশ রূপান্তরের সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত
সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, সাভারের আশুলিয়ায় বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া, বেতন বৃদ্ধিসহ শ্রমিকদের নামে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। গতকাল সকাল ৮টার দিকে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জিরাবো এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় লুসাকা কারখানার শ্রমিকরা। পরে তাদের সঙ্গে মন্ডল গ্রুপ ও ম্যাংগো ট্যাক্সের শ্রমিকরাও বিক্ষোভে যোগ দেন। এর ফলে শনিবারও শিল্পাঞ্চলে ৪১ কারখানা বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শিল্পপুলিশ জানায়, সকালে লুসাকা গ্রুপের শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরুর পর জিরাবো এলাকার মন্ডল নিটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরাও সড়কে নেমে এসে আন্দোলন শুরু করেন। ম-ল গ্রুপের শ্রমিকরা গত কয়েকদিন ধরে ন্যূনতম মজুরি ২২ হাজার টাকার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। শনিবার এদের সঙ্গে আরও কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা যুক্ত হয়ে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন।
লুসাকা গ্রুপের শ্রমিকরা জানান, গত ৯ সেপ্টেম্বর মালিকপক্ষ কারখানার ২৭ জন শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করে। পরে শ্রমিকরা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করলে গত বৃহস্পতিবার কারখানা খুলে দেওয়ার পর মালিকপক্ষ মামলা প্রত্যাহার করে আমাদের হাতে কপি দেবে বললেও আর তা দেয়নি। সকালে কারখানায় এসে দেখি মালিকপক্ষ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে। পরে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের বের করে এনে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
আশুলিয়া শিল্পপুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে আশুলিয়ার মোট ৪১টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩(১) ধারায় ১০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং বাকিগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্র্তৃপক্ষ। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল অব্যাহত রয়েছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে বিভিন্ন দাবিতে বেশ কয়েকটি স্থানে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে সড়ক অবরোধ করেন। শনিবার সকাল ৮টা থেকে মহানগরীর কোনাবাড়ীতে যমুনা ডেনিমস স্টাফরা ১৯ দফা দাবিতে এবং সদর উপজেলার মেম্বারবাড়ী এলাকায় সিলকন সুইং লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা ১৮ দফা দাবিতে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে সড়কের উভয় পাশে প্রায় ৫ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়। পরে দুপুর ১টার দিকে কর্র্তৃপক্ষ দাবি মেনে নিলে শ্রমিকরা সড়ক থেকে গেলে যান চলাচল শুরু হয়। এছাড়া সকাল ৯টা থেকে মহানগরীর দক্ষিণ সালনা পলাশটেক এলাকার এইচ. আর. ওয়ান ফ্যাশন লিমিটেড এবং এইচ. আর. ওয়ান এক্সেসরিজ কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন।
গাজীপুর শিল্পপুলিশ-২ সহকারী পুলিশ সুপার (কোনাবাড়ী জোন) জাহাঙ্গীর আলম জানান, সকালে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কারখানায় প্রবেশ না করে প্রধান ফটকে ১৯ দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা কোনাবাড়ী-কাশিমপুর সড়কে অবস্থান নেন।
অপরদিকে সদর উপজেলার বানিয়ারাচাল-ভবানীপুর মেম্বারবাড়ী এলাকায় সিলকন সুইং লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা সকাল থেকেই কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণসহ ১৮ দফা দাবিতে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় সড়কের উভয় পাশে প্রায় ৫ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। প্রায় চার ঘণ্টা পর দুপুর ১টার দিকে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ সব দাবি মেনে নিলে শ্রমিকরা সড়কে থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুর শিল্পপুলিশের পরিদর্শক ফারুক বলেন, শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ করা খবরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের বুঝালে তারা সড়ক ছেড়ে কারখানার সামনে অবস্থান নেন।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের টাকা পরিশোধ না করে কারখানা লে-অফ ঘোষণা করায় গতকাল সকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্স নামক গার্মেন্টস শ্রমিকরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা। আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সব বকেয়া বেতন পরিশোধ করবে এবং কারখানা চালু করবে এমন আশ্বাসে শ্রমিকরা শান্ত হন।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত বিকেএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা আসলাম সানির মালিকানাধীন ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্সের শ্রমিকরা শনিবার সকালে বকেয়া বেতনভাতা পরিশোধের দাবিতে ও কারখানাটি লে-অফ ঘোষণার প্রতিবাদে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। এতে করে ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং যানজট সৃষ্টি হয়।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি সোলায়মান মাহমুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করলে সেনাবাহিনীসহ পুলিশ তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। পরে সেনাবাহিনী কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অবন্তী কালার টেক্স গার্মেন্টসের শ্রমিকদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হক, পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার, সেনাবাহিনীর মেজর আয়াজ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. তরিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, বিপ্লব গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি মাহমুদ হোসেন, শ্রমিক জাগরণ মঞ্চের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম গোলক, একে এম আবু সাঈদ, মোশারফ হোসেন, মো. মামুন, বিসিকের শ্রমিক নেতা মো. রমজান শেখ, মো. রাজু প্রমুখ।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল জানান, দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কারখানাটির ৬ হাজার শ্রমিকের মধ্যে অন্তত দেড়শ শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনরা শ্রমিকদের বক্তব্য শুনেছেন। ক্রোনির মালিক জেলা প্রশাসককে কথা দিয়েছেন আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে সব শ্রমিকের বকেয়া বেতন পরিশোধ করবেন এবং কারখানাটি খুলে দেবেন। পরে শ্রমিকরা শান্ত হন।
