ফেনী

সাম্রাজ্যের পতনের পর পালিয়ে বাচঁলেন দুই হাজারী

  • ৩০ বছর ফেনী শাসন করেন দুই চাচাতো ভাই
  • জয়নাল হাজারীর ‘এক নেতা, এক জেলা’ কৌশল রপ্ত করেন নিজাম
  • নিজাম হাজারীর নামে প্রতিদিন কোটি টাকা চাঁদা তোলা হত
  • দুইজনই ভারতে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছেন
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:৫০ পিএম

জয়নাল আবেদীন হাজারী ও নিজাম উদ্দিন হাজারী— ১৯৮৬ সালের পর ৩০ বছর ফেনী শাসন করেন এ দুই হাজারী। সম্পর্কে চাচাতো ভাই হলেও ক্ষমতার দাম্ভিকতায় কেউ কাউকে ছাড় দেননি। একজন ফেনীর গডফাদার হিসেবে খ্যাত, আরেকজন ফেনীর মুকুটহীন সম্রাট। ক্ষমতার পালাবদলে দুইজনই পার্শ্ববর্তী ভারতে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছেন।

ফেনীর একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন জয়নাল হাজারী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানা ঘটনাচক্রে বিএনপির ভিপি জয়নালের কাছে হারান তার সেই অবস্থান। কালের পরিক্রমায় ফেনীর রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আরেক হাজারীর হাতে। তিনি নিজাম হাজারী।

১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্ট ফেনী শহরের সহদেবপুরের হাবিবুল্লাহ পণ্ডিতের বাড়িতে আব্দুল গণি হাজারী ও রিজিয়া বেগমের সংসারে জন্ম নেন জয়নাল হাজারী। ১৯৮৪ সাল থেকে টানা ২০ বছর ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ফেনী-২ (সদর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে জয়নাল হাজারী ফেনীতে ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেছিলেন। সে সময় ফেনীতে তার নেতৃত্বে ‘স্টিয়ারিং কমিটি’, ‘ক্লাস কমিটি’ গঠনসহ নানা ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের পাশাপাশি নিজ দলের বিরোধীদের ওপরও নির্যাতন চালান জয়নাল হাজারী। সে সময় সাংবাদিকেরাও তার নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি।

মূলত ১৯৯৬ সালের পর তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ফেনীতে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রায় ১২০ জন নেতাকর্মী মারা যান।

২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই বছর ১৭ অক্টোবর রাতে ফেনী শহরের মাস্টার পাড়ায় জয়নাল হাজারীর বাসভবনে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। সে সময় তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান। আট বছর বাইরে থাকার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরলে দেশে ফেরেন জয়নাল হাজারী। পলাতক থাকা অবস্থায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। ২০১৯ সালে তাকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীতে স্থান দেওয়া হয়। তারপর আর ফেনীর রাজনীতিতে অবস্থান তৈরি করতে পারেননি।

২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

অপরদিকে নিজাম হাজারীর রাজনীতি শুরু জয়নাল হাজারীর ছায়াতলে ১৯৯৬ সালে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেন তার ঘনিষ্ঠ সহচর। রপ্ত করে নেন নিজ রাজনৈতিক গুরুর ‘এক নেতা, এক জেলা’ মূলমন্ত্রটিও। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে আওয়ামী রাজনীতির হাল ধরতে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী আসেন নিজাম হাজারী। ধীরে ধীরে তৈরি করেন নিজের আধিপত্য। কোণঠাসা করে দেন জয়নাল হাজারীকেও। স্থানীয় রাজনীতিতেও ক্রমেই এগোতে থাকেন তিনি। ফেনীর রাজনীতি থেকে জয়নাল হাজারীর প্রস্থান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় তিনিই হয়ে ওঠেন জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঠিক এক বছর পরই ফেনী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। পরপর তিনবার পালন করেন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব। দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন। ফেনী-১ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেত্রী শিরিন আখতার। ফেনী-৩ আসনের এমপি জাতীয় পার্টির নেতা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ফলে পুরো ফেনী জেলার আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলে আসে তার হাতে। এ রকম পরিস্থিতিতে দল ও দলের বাইরে নিজাম হাজারীর তেমন কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বললেই চলে। 

এ প্রভাবশালী নেতা জীবনের নানা সময় বিভিন্ন মামলায় জেল খেটেছেন। ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো অস্ত্র মামলায় জেলে যান নিজাম হাজারী। এক বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। আবারো ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জেল খাটেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তৈরি করেন নিজের ক্যাডার বাহিনী। অভিযোগ আছে, অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত নিজাম হাজারী পুরো সাজা শেষ না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে বেরিয়ে এসে জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন, যা আইনের পরিপন্থী। কিন্তু টাকা আর আধিপত্যের কারণে আইনকেও তোয়াক্কা করেননি নিজাম হাজারী।

অভিযোগ রয়েছে, দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন নিজামী হাজারী। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দখলে নেওয়া চক্রের সাবেক ৪ এমপির মধ্যে তিনি অন্যতম। চক্রটি দেড় বছরে ২৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে। ২০১৪ সালের ২০ মে ফেনীতে দিন-দুপুরে গুলি ও গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামকে হত্যা করা হয়। এভাবে আরও অনেক লাশ পড়ে। কিন্তু সব সময় নিজাম হাজারী ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, নিজাম হাজারীর নামে ফেনীতে প্রতিদিন উঠানো হত কোটি টাকার বেশি চাঁদা। তাকে কমিশন না দিয়ে কোনো উন্নয়ন কাজ হত না। অগ্রিম কাজের টাকা দেওয়া এমন অনেক ঠিকাদার এখন বিপাকে পড়েছেন। ফারুক হোসেন নামে এক ঠিকাদার জানান, সড়কের দুই কোটি ৭৮ লাখ টাকার একটি কাজের জন্য নিজাম হাজারীকে অগ্রিম ৪০ লাখ টাকা দিয়েছেন। এখন তিনিও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অবশেষে ফেনীতে কমেছে নিজাম হাজারীর আধিপত্য। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সাথে সাথে হাজার কোটি টাকার সম্পদ রেখে পালিয়েছেন তিনি। কিন্তু যাওয়ার আগের দিনও তার নির্দেশে ফেনীতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের চালানো গুলিতে ঝরেছে ১১টি তাজা প্রাণ। এ ঘটনায় নিজাম হাজারীসহ প্রায় তিন হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে আসামি করে ৮টি মামলা করেছেন নিহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। কবে গ্রেফতার হয়ে বিচারের আওতায় আসবেন নিজাম হাজারীসহ এসব হত্যা, লুটপাট ও চাঁদাবাজীর হোতারা সেদিকে চেয়ে আছে ফেনীবাসী।

ফেনীর পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৪ আগস্ট মহিপালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটটি হত্যা মামলার আসামি নিজাম হাজারী। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসছে। তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত