‘আমাদের দুঃখের নাম তিস্তা, আর নদীর নাম কান্না’

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪, ১২:২১ এএম

গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উত্তরের চার জেলা লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে ২৩ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিস্তা ছাড়াও জেলার প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছে। পাউবোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ধরলা, গঙ্গাধর, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানিবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র রংপুর থেকে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও তিস্তার পানি বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে কাউনিয়া ছাড়াও পীরগাছা ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় নদীপাড়ের মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এই তো কিছুদিন আগে একই কারণে, মানে টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়ে আমাদের পূর্বাঞ্চলে সিলেট, সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা। বন্যার পানি নেমে গেলেও এখন সেখানকার মানুষ বন্যাপরবর্তী ধকল সামলাচ্ছেন। সদ্য গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কালখ-ে ওই বন্যা মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছিল আপামর জনতা এবং অন্তর্বর্তী সরকার। মিডিয়াও ছিল বন্যাদুর্গতদের দুর্দশা নিয়ে সরব। ফলে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলের এবারের বন্যা তেমন মনোযোগ পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু বন্যার পানি নিশ্চই উত্তর কিংবা পূর্বের মানুষ হিসাব করে ভোগান্তির সৃষ্টি করে না।

তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে বন্যায় ভাসা কিংবা খরায় পোড়া নতুন নয়। সাম্প্রতিক বন্যার প্রসঙ্গে ফাত্তহ সিয়াম নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন ‘আমাদের দুঃখের নাম তিস্তা, আর নদীর নাম কান্না, আর বন্ধুর নাম ভারত। উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর মরণদশা হয়। আর বর্ষায় উজানের পানিতে নদীর তীরে বন্যা ও ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছেন মানুষেরা। তিস্তাপাড়ের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের এ দুর্ভোগ শেষ হবে কবে? কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী বা সিলেটের বন্যা মানুষের মনে সাড়া জাগাতে পারলেও পারেনি রংপুরের লালমনিরহাটের বন্যার্তদের আর্তনাদ।

নদী বয়ে চলে উজান থেকে ভাটির দিকে। প্রাকৃতিক এই নিয়মকে রাজনৈতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে বাংলাদেশের উজানের দেশ ভারত। শুধু নৈতিকভাবে নয়, আন্তর্জাতিক সব বিধিবিধানকেও তোয়াক্কা করছে না তারা। একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীকে আন্তর্জাতিক নদী বলা হয়ে থাকে। সেই বিবেচনায় ভারত থেকে বয়ে আসা ৫৪টি নদীই আন্তর্জাতিক নদী। কিন্তু ভারত সেগুলোর ওপর এক বা একাধিক বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তিস্তার উজানে ভারত গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভারতীয় অংশে সেচের সম্প্রসারণ। এই বাঁধ দিয়ে প্রথম পর্যায়েই প্রায় ১০ লাখ হেক্টর, অর্থাৎ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে জন্য ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল করা হয়েছে। এসব খাল একদিকে পশ্চিম-দক্ষিণে অগ্রসর পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলা পর্যন্ত পৌঁছেছে, অন্যদিকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলা পর্যন্ত গেছে। অর্থাৎ গজলডোবা বাঁধ একটি বিস্তৃত পরিধিতে সেচ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নির্মিত হয়েছে। এই বাঁধের মাধ্যমে ভারত কর্র্তৃক তিস্তার পানি অপসারণের কোনো উচ্চ সীমা নির্ধারিত নেই। ফলে ভাটির দেশের কথা কোনোভাবেই বিবেচনায় না নিয়ে নতুন নতুন খাল খননের মাধ্যমে ভারত তিস্তা নদীর পানি অপসারণের ক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। আর বাংলাদেশ অঞ্চলে তিস্তা হারাচ্ছে তার বেঁচে থাকার মতো পানি। শুষ্ক মৌসুমে এই নদ-নদীগুলোর জলের জন্য চাতক পাখির মতো সীমান্তের ওপারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। কিন্তু বর্ষায় অতিরিক্ত জলের সময় বিনা নোটিসে গজলডোবায় জলের কপাট খুলে দিলে তিস্তাপাড়ের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মানুষের সব কিছু ধুয়েমুছে নিয়ে যায়।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা কি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? তিস্তা নদী সুরক্ষায় অবিলম্বে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। অভিন্ন নদী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। তিস্তা নদীতে সারা বছর পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে জলাধার নির্মাণ, তিস্তা নদীর শাখা-প্রশাখা ও উপশাখাগুলোর সঙ্গে নদীর পূর্বেকার সংযোগ স্থাপন ও নৌচলাচল পুনরায় চালু করতে হবে। বন্যা এবং নদীভাঙনের শিকার ভূমি-গৃহহীন ও মৎস্যজীবী মানুষের পুনর্বাসন, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় তিস্তা নদী ও এর তীরবর্তী কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় কৃষক সমবায় ও কৃষিভিত্তিক কলকারখানা গড়ে তোলা এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তাপাড়ের মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। জলকপাটগুলোকে প্রকৃতিবিরোধী বলছেন নদীজন ও গবেষকরা। গজলডোবা থেকে ডালিয়া পর্যন্ত বিপুল এলাকা খোদ ভারতেই বালুকাময়। জলশূন্য তিস্তা। আবার যতটুকু জল আসে সেটিও ক্যানেল দিয়ে ঠেলে সেচ প্রকল্পে নিয়ে যাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের দক্ষিণে চিলমারী পর্যন্ত ভীষণ খরায় থাকে তিস্তা।

ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দগদগে স্মৃতি এই অক্টোবরে মানুষের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আর তাই রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে ফ্যাসিস্ট সরকারের ছুটে আসা বুলেট বিদ্ধ হওয়ার দৃশ্যও চোখ বুজলেই দেখতে পারবেন। যার গল্প অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তৃতায় বারবার বলেছেন। গত ১০ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস রংপুরে আবু সাঈদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। এ সময় তিনি রংপুর জেলাকে এক নম্বর করার প্রতিশ্রুতি দেন যা নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে, এখন আবু সাঈদের রংপুর বন্যায় ভাসছে, তাকে ভেসে যেতে দেওয়া যাবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত